ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২১ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এতে বিজয়ী হতে পারেন আনুরা কুমারা। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের ফলে সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতার অদল-বদল ঘটে। মাহিন্দ্র রাজাপাকসে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর ৭৫ বছর বয়সী রনিল বিক্রমাসিংহে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে রাজাপাকসে ক্ষমতায় বসেন। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বাকি মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হন বিক্রমাসিংহে। তাকে নির্বাচিত করেন দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যরা। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ক্ষমতা গ্রহণ করেন বিক্রমাসিংহে। ঘোষণা অনুযায়ী ২১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বিক্রমাসিংহে। এ ছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা সজিথ প্রেমাদাসাও রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবে এবার বেশি আলোচনা হচ্ছে সংসদ সদস্য এবং মার্কসবাদী জনতা বিমুক্তি দলের নেতা আনুরা কুমারা দিসানায়েকে। ৫৫ বছর বয়সী আনুরা ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন। সেবার হেরে গেলেও, এবার তার সম্ভাবনা বেশি দেখছেন বিশ্লেষকরা। আল জাজিরা বলেছে, আনুরা ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার নামে যে রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দেন, তারা এমনকি প্রধান বিরোধী দলও নয়। দেশটির ২২৫ সদস্যের সংসদে মাত্র তিনটি আসন রয়েছে তাদের। সংসদে তারা চতুর্থ বৃহত্তম শক্তি। উপরন্তু আনুরা ভারতের প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে সখ্য রাখেন। কিন্তু এখন কয়েক মাস ধরে দিসানায়েকে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছেন। যার ফলে তিনি আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের কাছেও উঠতি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এসব কারণে ২১ সেপ্টেম্বরের ভোটে তিনিও প্রেসিডেন্ট পদের জন্য শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। কিছু জনমত জরিপে ৩৮ প্রার্থীর মধ্যে তিনি এগিয়ে আছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনুরা কুমারা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং সিনিয়র কূটনীতিকদের সঙ্গে দেখাও করেছেন নয়াদিল্লিতে।
যেভাবে জনপ্রিয়
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে বরাবরই পরিবারতন্ত্র দেখা গেছে। যেমন নমাল রাজাপাকসে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের বড় ছেলে। সজিথ প্রেমাদাসা আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট আর প্রেমদাসার ছেলে। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে দেশের প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট জেআর জয়বর্ধনের ভাগ্নে। আনুরা এই পরিবারতন্ত্রের বাইরে। তিনি জনতা বিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) নেতা। তার দল যদিও কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি ছিল না। তবে তারা একাধিকবার মার্কসবাদী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছে। তার দল এবং জোটের উত্থানের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থান। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাপক ঘাটতি এবং আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। তখন গণবিক্ষোভ দেখা দেয়। সেই বিক্ষোভের ফলে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা পদত্যাগে বাধ্য হন। বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তারা। যদিও কোনো রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে ওই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দাবি করেনি। তবে আনুরার দল এতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিনের প্রতিবাদ-সংগ্রামে তারা উপস্থিত ছিল। কলম্বোর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে তাঁবু তৈরি করে অবস্থান এবং সাধারণ ধর্মঘট সংঘটিত করতেও তার দলের ভূমিকা দেখেছে সবাই। সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কর্মসূচি শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের আকৃষ্ট করেছে। ধীরে ধীরে দলটি বিশ্বাসযোগ্য ও অন্যতম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনে তাদের ভূমিকার ফলে আনুরার ব্যক্তিগত ও তার দলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক গামিনি ভিয়ানগোদা আল জাজিরাকে বলেন, আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তিনি ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় সৎ। যখন তিনি বলেন, তিনি (আনুরা) দুর্নীতির দরজা বন্ধ করে দেবেন, আমি বিশ্বাস করি যে, তিনি এটি বোঝাতে চেয়েছিলেন। তিনি এটি করতে সক্ষম হবেন কিনা তা অন্য বিষয়, তবে আমি অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার মধ্যে এই অকৃত্রিমতা দেখিনি।
ব্যর্থ বিদ্রোহ
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ১৭৭ কিলোমিটার দূরে আনুরাধাপুরা জেলার থামবুটেগামা গ্রামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আনুরা দিসানায়েকে। তিনি কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি তার স্কুলজীবন থেকে তার দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য হন। দিসানায়েককে ২০১৪ সালে জেভিপি নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারপর থেকে তিনি দলের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছেন। তার দল ১৯৭১ সালে এবং তারপর ১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে, ব্যর্থ মার্কসবাদী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল। আবার ১৯৮৮-৮৯ সালে জেভিপি প্রেসিডেন্ট জেআর জয়াবর্ধনে এবং আর প্রেমাদাসার সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে তাদের উৎখাতের আহ্বান জানায়। যা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত। ওই সময় ব্যাপক আকারে হত্যাকাণ্ড চলে। কারফিউ, নাশকতা এবং ধর্মঘট ডাকে জেভিপি। মার্কসবাদীরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে বলে মনে করা হয়, যাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকার গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, অপহরণ ও গণহত্যার মাধ্যমে বিদ্রোহকে নির্মমভাবে দমন করে। সরকারি ক্র্যাকডাউনে কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ নিহত হয়, যার বেশিরভাগ জেভিপি নেতা ছিল। ব্যর্থ বিদ্রোহের পর যখন পার্টি সহিংসতা পরিত্যাগ করে এবং নির্বাচনী গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে থাকে তখন দিসানায়েকে পলিটব্যুরোতে নিযুক্ত হন। ২০১৪ সালের মে মাসে বিবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় আনুরা দিসানায়েক পার্টির অতীত অপরাধের জন্য ক্ষমা চান। এরপর থেকে তিনি বেশ কয়েকবার দুঃখ প্রকাশ করেছেন দলের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য। অপরদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিক্রমাসিংহে ১৯৮০-এর দশকে জেভিপি বিদ্রোহের সময় প্রেমাদাসা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ রয়েছে, তিনি তখনকার ক্র্যাকডাউনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। অনেক বয়স্ক শ্রীলঙ্কানের মনেও জেভিপির ওই রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের ঘটনা মনে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আনুরা দিসানায়েকে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ এবং সামরিক কর্মকর্তাসহ সমাজের এমন অংশকে নিয়ে একটি বিস্তৃত জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যারা ওই বিদ্রোহের সময় জেভিপির প্রতিপক্ষ ছিল। এখন তাদের সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন নেতারাও রয়েছেন। আর দলের সবচেয়ে বড় পরিচিতি দুর্নীতি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি। ভিয়ানগোদা বলেন, আমি মনে করি জেভিপি ৮৯-৯০ সালে যা করেছিল, তার জন্য এখন নিন্দা করা ভুল। কারণ আমরা আজ যা দেখছি, তা ১৯৮০-এর দশকের জেভিপি নয়।
শ্রীলঙ্কার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) এবং শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এই প্রথা দিসানায়েককে ভেঙে দিতে হবে। দিসানায়েক আশা করছেন, ২১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জয়ী হবেন।
তামিল প্রশ্নে
তবে তামিল বিদ্রোহ দমনে শ্রীলঙ্কার তখনকার সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছেন আনুরা। তিনি বলেছেন, তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে রাজাপাকসে সরকারের যুদ্ধকে সমর্থন করার জন্য অনুশোচনা করেন না। যদিও জেভিপি দীর্ঘদিন ধরে শ্রীলঙ্কায় ভারতের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। তবে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে ভারতের ভূমিকার পক্ষেই তার অবস্থান। ভারত ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শ্রীলঙ্কায় সৈন্য পাঠায়। জেভিপি তামিল বিদ্রোহীদের বিরোধিতা করেছিল, কারণ তারা মনে করত এ আন্দোলনের ফলে শ্রীলঙ্কা বিভক্ত হবে। ২০০০ সালের শুরুর দশকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে চূর্ণ করে দেন, জেভিপি তখন এতে সমর্থন দিয়েছিল। তামিল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে তামিলদের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযানকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, হাসপাতালসহ বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নির্বিচারে গোলাবর্ষণ, জোরপূর্বক গুম, ব্যাপক বেসামরিক হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং মানবিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান। তবে জেভিপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার এ ধরনের কোনো তদন্তের দাবি জানাতে অস্বীকার করেছে। এনপিপি অধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত কাউকে শাস্তি দিতে চাইবে না বলেও জানিয়েছেন আনুরা।
অর্থনীতি
রাজাপাকসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট বিক্রমাসিংহে দেশের অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে একটি আর্থিক প্যাকেজ পান। যদিও কিছু বিশ্লেষক এবং বিক্রমাসিংহের সমর্থকরা আইএমএফের সঙ্গে চুক্তির প্রশংসা করছেন। তবে দিসানায়েকে সমালোচনা করে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে চুক্তির পর সরকারি কর বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং সামাজিক কল্যাণ সহায়তা হ্রাস করে। বিশেষ করে জ্বালানি এবং বিদ্যুতের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর ওপর উচ্চ কর এবং হ্রাসকৃত ভর্তুকি নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্লেষকরা আল জাজিরাকে বলেছেন, দিসানায়েকে শুল্ক কাঠামোর সরলীকরণ, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি, কর প্রশাসনের সংস্কার, দুর্নীতির অবসান এবং ব্যক্তিগত খাতকে সহায়তার ওপর জোর দিয়ে একটি বাণিজ্য সহায়ক পদ্ধতির পক্ষে কথা বলেছেন। তবে ঋণ আলোচনার বিষয়ে তার অবস্থান অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তিনি বর্তমান আইএমএফের প্রোগ্রামের মধ্যে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার জন্য আইএমএফ চুক্তির পুনর্বিবেচনা করা অপরিহার্য। বর্তমান শর্তগুলো সর্বোত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুস্থতার জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করে।
