‘আওয়ামী লীগের দোসররা এখনো সক্রিয়। তারা বিভিন্ন অজুহাতে ফিরে আসতে চাইছে। আমরা এদের আর ফিরে আসার সুযোগ দেব না। তাদের ফোনালাপে শোনা যায়, দেশের আশপাশে আছে। চট করে ঢুকে পড়বে। আমরা চাই আপনি (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) চট করে ঢুকে যান। আমরাও খপ করে ধরে ফেলব।’ গতকাল রবিবার ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এসব কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবদুল কাদের।
দেশ সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে ছাত্র-জনতার মতামত জানতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে সফর করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ফেনী সফরে যায় কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি দল। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ সফর করে আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলমের নেতৃত্বাধীন আরেকটি দল।
এদিকে গতকাল মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুপক্ষের দ্বন্দ্বে কাওয়ালি অনুষ্ঠানে হামলায় নারীসহ চারজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে দিনাজপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সমন্বয়কদের কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
বিশেষ কোনো দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য আন্দোলন করেননি উল্লেখ করে ফেনীর মতবিনিময় সভায় কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবদুল কাদের বলেন, ‘বিপ্লব-পরবর্তী মতানৈক্য বিপ্লবকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারুণ্য সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। দেশে বাকস্বাধীনতা ছিল না, গণতন্ত্র ছিল না। আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। বিগত সময়ে ফেনীর মানুষ কথা বলতে পারেনি। তাদের হাসিনার দোসররা অনেকটা জিম্মি করেছিল; যেন বসবাস ছিল জেলখানায়।’
এই মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি ও ফেনীতে নিহত এবং আহত পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যায়কারী যদি পুলিশ হয় তারও বিচার হতে হবে : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছেন, পুলিশের যদি বিচার না হয়, তাহলে রাষ্ট্রের অন্য এক নাগরিকের বিচার করার বিষয়ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা বিচারের বাইরের কেউ নয়। পুলিশ বা অন্য যে কেউ হোক, যে দোষী তার বিচার হতে হবে। গতকাল মানিকগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শহীদ ও আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এসব কথা বলেন তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের বিচার প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব সদস্য সরাসরি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। তা আইনগতভাবে তদন্ত, মামলা কিংবা অন্য কোনো প্রসেসে (প্রক্রিয়ায়) হোক। কেউ একজন অতি উৎসাহিত হয়ে নিজের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের কাছে নিজেকে তুলে ধরার জন্য অন্যায়ভাবে নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে নির্দেশ পালন করেছেন। তারা অন্যায়কারী। সে যদি পুলিশও হয়, তা হলেও সমান দোষে দোষী।’
সকালে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন সারজিস। পরে দুপুরে আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এরপর বিকেলে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় এ সমন্বয়ক।
মাদারীপুরে দুপক্ষের দ্বন্দ্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা : মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুপক্ষের দ্বন্দ্বে কাওয়ালি অনুষ্ঠানে হামলায় নারীসহ চারজন আহত হয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে হামলার এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন মাদারীপুর সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিয়ামত উল্লাহ (২২), হিসাববিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর তামিম (২৩), দ্বাদশ শ্রেণির ইসতিয়ার আহম্মেদ (২০) ও শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা সাথী (২১)। তাদের মধ্যে তিনজনকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ‘সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে কাওয়ালি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি অংশ। এতে জুবায়ের আহম্মেদ নাফির নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেকপক্ষ বাধা দেয়। একপর্যায়ে নিয়ামত উল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা শাবাব, সদর মডেল থানার ওসি এএইচএম সালাউদ্দিন ও সেনাবাহিনীর একদল সদস্য ঘটনাস্থলে যান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে প্রশাসনের লোকজন চলে গেলে শিক্ষার্থীদের ওপর একদল দুর্বৃত্ত হামলা করলে অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে প্রশাসন। হামলার ঘটনার পর সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
দিনাজপুরে হাতাহাতি : স্থানীয় সমন্বয়কদের কয়েকটি গ্রুপের হাতাহাতির মধ্য দিয়ে দিনাজপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মতবিনিময় সভা হয়। গতকাল বিকেলে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবু সাঈদ প্রিন্স ও তরিকুল ইসলাম এবং সহসমন্বয়ক মুনিম ইসলাম, রকিব মাসুদ, এসআই শাহিন, সজিব ইসলাম, মিশু আলী সুহান, রেদওয়ান ইসলাম ও রিফাত ইসলাম। সভা চলাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলার কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। পরে কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। এ সভা ঘিরে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন ছিল।
দেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান চাঁপাইনবাবগঞ্জে : কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জেও গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতারা মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। বিকেলে শহরের শহীদ সাটু হলে ছাত্র ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ সভা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা মাহিন সরকার, কুররাতুল আইন কানিজ, সাইফুল ইসলাম, ইফতেখার আলম আসাদ ও আবদুল্লাহ আল মাহমুদ মেহেদীসহ স্থানীয় নেতারা। এর আগে একই স্থানে আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারা। সভায় আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তারা বলেন, দেশ নতুনভাবে স্বাধীন হয়েছে। ভারতের দাসত্ব বাদ দিয়ে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
এর আগে সকালে আন্দোলনে নিহত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও গোমস্তাপুর উপজেলার দুজনের কবর জিয়ারত করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা
