সম্প্রতি ছাত্র-জনতার হার না মানা আন্দোলনে পরাজিত হয়েছে জালেম শাসক। এরপর দেশের প্রশাসনের ভঙ্গুরে অবস্থা চোখে পড়ার মতো। প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে একশ্রেণির হুজুগে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। যা দেশের আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকি তা ইসলামের দৃষ্টিতেও মারাত্মক গর্হিত ও অন্যায় কাজ। এতে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা। আবার সেই বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য ক্ষেত্রেও। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলায় জড়ানো মুমিন ব্যক্তির কাজ নয়। মুমিন ব্যক্তির গুণ হলো সে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করবে, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে, কোনো ধরনের অরাজকতায় লিপ্ত হবে না, দেশের আইন মেনে চলবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না, অন্যের কল্যাণ সাধন করবে এবং দশের উন্নয়নে কাজ করবে।
ইসলাম মানুষের শান্তি ও মুক্তির কথা বলে। ইসলাম কখনো দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈরাজ্য, নাশকতা, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে প্রশ্রয় দেয় না। সমাজ জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। অশান্তি-বিশৃঙ্খলা এবং ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টিকে কোরআনে হত্যার চেয়েও গুরুতর পাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবুও এ পাপ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন ও গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা একটি ফেতনা-অশান্তি সমাজে অসংখ্য ফেতনা-অশান্তি ও অরাজকতার জন্ম দিতে পারে। তাই ফেতনা-অশান্তি সৃষ্টির বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘ফেতনা (বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অশান্তি সৃষ্টি করা) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর পাপ।’ (সুরা বাকারা ১৯১) সম্প্রতি মাজার ভাঙার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দেশের একাধিক জায়গায় মাজারে হামলা হয়েছে। মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মাজার আরবি শব্দ। এর অর্থ পরিদর্শনস্থল বা জিয়ারতের জায়গা। মাজার সাধারণত পীর-বুজুর্গদের কবরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যেসব পীর-বুজুর্গ ছিলেন মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা। সাধারণ মুসলমানরা তাদের মাজারে গিয়ে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও দোয়া পড়ে তাদের জন্য সওয়াব পৌঁছে দেন এবং তাদের অছিলা করে মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের জন্য দোয়া করেন। এটাই মাজারের উদ্দেশ্য এবং মাজারকেন্দ্রিক এতটুকু কাজই শরিয়তে বৈধ। এর বাইরে মাজারে গিয়ে পীরের উদ্দেশে সিজদা করা, সরাসরি পীরের কাছে প্রার্থনা করা, পীরের নামে কোনো কিছু উৎসর্গ করা এগুলো জঘন্যতম শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী এমন কাজ করার পর কেউ আর মুসলমান থাকতে পারে না। এ ছাড়া মাজারকেন্দ্রিক গাঁজার আসর বসানো নিত্যনৈমিত্তিক একটি ব্যাপার।
যেসব হুজুগে জনতা মাজার ভাঙচুরে লিপ্ত হচ্ছেন তাদের বক্তব্য হলো মাজারে উল্লিখিত শিরকি কাজ এবং নানা ধরনের অপকর্ম হয়। তাই তারা সওয়াবের উদ্দেশে এমন কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। আচ্ছা, শিরক ও অপকর্ম দূর করার জন্য মাজার ভাঙচুর করলে কোনো সওয়াব হবে কী? উত্তর হলো, কোনো সওয়াব হবে না। উল্টো গুনাহ হবে। মাজার ভাঙাও এক ধরনের অরাজকতা। কেননা তাদের মাজার ভাঙার অথরিটি কেউ দেয়নি। ইসলামও দেয়নি, রাষ্ট্রও দেয়নি। সুতরাং যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মাজারে হামলা করছেন তারা ইসলামের দৃষ্টিতেও অপরাধী, রাষ্ট্রীয় আইনেও অপরাধী। উদাহরণস্বরূপ : ইসলামি রাষ্ট্রে কেউ চুরি করে ধরা পড়েছে। ইসলামে চুরির শাস্তি হচ্ছে হাত কেটে দেওয়া। এখন চুরের হাত কে কাটবে? সাধারণ জনগণ না প্রশাসন? অবশ্যই প্রশাসন। যদি সাধারণ জনগণ চুরের হাত কেটে দেয়, তাহলে তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিল, যা কোনোভাবেই বৈধ নয়। এ জন্য তাদের শাস্তি পেতে হবে। যারা মাজার ভাঙচুর করছেন তাদের উদ্দেশে কথা হলো, কোনো গোষ্ঠী যদি মাজারকেন্দ্রিক শিরকে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের আস্তানা বা মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আদেশ, উপদেশ ও শিক্ষা আপনারা কোথায় পেলেন? আপনারা কি হজরত রাসুল (সা.)-এর দাওয়াতি কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নেন না? তিনি লোকজনকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, দাওয়াত দিতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন তবুও দাওয়াতি কার্যক্রম বন্ধ করেননি। আর আপনারা ইসলামের কে বা কোত্থেকে এসেছেন যে, হামলা-ভাঙচুরের মাধ্যমে শিরকমুক্ত করবেন? এই অথরিটি আপনাদের কে দিয়েছে? বাংলাদেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেও আপনারা মাজার ভাঙার দায়িত্ব পাবেন না। যা হোক, যেকোনো সময়ই ভাঙচুরে না গিয়ে তাদের পুনর্বাসনই হবে যথাযোগ্য ব্যবস্থা। বর্তমানে সার্বিকভাবে আমাদের দেশের যে পরিস্থিতি, এমতাবস্থায় আমরা হজরত রাসুল (সা.)-এর মক্কী জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারি। এখান থেকে শিক্ষা নিলে আমরা বুঝতে পারব ভাঙচুর ও শক্তি প্রয়োগ করে নয়, বরং দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে তাদের বোঝাতে হবে। যদি তারা বুঝে এবং শিরক থেকে ফিরে আসে তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি না বুঝে, তাহলে আমরা তাদের থেকে দায়িত্বমুক্ত এবং আমরা তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগকারীও নই। কোরআনে আল্লাহতায়ালা হজরত রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আপনি উপদেশ দিন। আপনি একজন উপদেশদাতা মাত্র। আপনি তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগকারী নন।’ (সুরা গাশিয়াহ ২১-২২)
উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরের বিষয়ে ইসলামি স্কলাররা বলেন, ‘হজরত রাসুল (সা.) যখন মক্কার মুশরিকদের দাওয়াত দেন কিন্তু তারা শিরক থেকে মুক্ত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে না, তখন আল্লাহতায়ালা এই আয়াত নাজিল করে বলেন, আপনার ন্যায়সংগত যুক্তি মানতে যদি কোনো ব্যক্তি প্রস্তুত না হয়, তাহলে মানা না মানা তার ইচ্ছা। আপনি তাদের প্রতি এমন দায়িত্বশীল নন যে, তাদের জোর করে ইমানদার বানাতেই হবে। আপনার কাজ শুধু প্রচার করা এবং উপদেশ দেওয়া। লোকদের ভুল ও সঠিক এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য জানিয়ে দেওয়া। তাদের ভুল পথে চলার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। কাজেই এ দায়িত্ব আপনি পালন করে যেতে থাকুন। এতটুকু করেই আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।’ উল্লিখিত আয়াত থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, আমরা তাদের প্রতি দাওয়াতি কার্যক্রম অব্যাহত রাখব এবং তাদের বোঝাব। তারা যেন শিরকি কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে। আর সেখানে গাঁজা ও মাদক সেবনসহ যেসব অরাজকতা চলে, তা প্রতিহত করার জন্য দেশে আইন রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
