হাইওয়েতে নেই পুলিশের সেবা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:১৬ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশের দুটি বক্সে। দুই মাস গত হলেও বক্স দুটি মেরামত করা হয়নি। নরসিংদীতে দুর্বৃত্তদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ইটাখোলা হাইওয়ে থানা ও পাঁচদোনা পুলিশ ফাঁড়ি। এখনো সংস্কার হয়নি প্রতিষ্ঠান দুটি। গাজীপুরের শ্রীপুরে হাইওয়ে পুলিশসেবায় গতিতে ফিরতে পারেনি। ফলে মহাসড়কে অরাজকতা আর অবৈধ যানবাহনের আধিপত্য বাড়ছে। বেড়েছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

দুই মাসেও মেরামত হয়নি দুটি পুলিশ বক্স : সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় ও সাইনবোর্ড বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের দুটি পুলিশ বক্স রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ বক্স দুটি থেকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে গত ২০ জুলাই বক্স দুটিতে হামলা হয়। এ সময় বক্সে ভাঙচুর চালিয়ে আসবাবপত্র, সিলিং ফ্যান এমনকি জানালার গ্রিল পর্যন্ত খোলে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এতে দায়িত্ব পালন করতে এখন চরম বেকায়দায় পড়েছে হাইওয়ে পুলিশ।

হাইওয়ে পুলিশের শিমরাইল ক্যাম্পের ট্রাফিক পরিদর্শক আবু নাঈম সিদ্দিকী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বক্স দুটি মেরামত বাবদ ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে গত ১৯ আগস্ট একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। পরে প্রাক্কলনটির প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের জন্য নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে ২৮ আগস্ট হাইওয়ে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় বক্স দুটি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘বক্স দুটি মেরামত না হওয়ায় দায়িত্ব পালন করতে আমাদের খুব অসুবিধা হচ্ছে। বৃষ্টি হলে বসার জায়গা নেই। তবু অনেক কষ্ট করে আমাদের ব্যারাক থেকেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ব্যারাকটি একটি ভবনের আটতলায় অবস্থিত। সেখান থেকে বারবার ওঠানামা করা অনেক কষ্ট হয়।’

নরসিংদীতে সংস্কার হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়ি, ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চালু : গত ১৯ জুলাই ইটাখোলা হাইওয়ে থানা ও পাঁচদোনা পুলিশ ফাঁড়ি হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ভেতরে থাকা সব জিনিসপত্র লুট করে নেয়। ভাঙচুর করা হয় ভবনের দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ইটাখোলা গোল চত্বরের পাশেই ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশ থানা। চারতলা ভবনের থানাটি সীমানা প্রাচীরঘেরা। ঘটনার পর থেকে থানার প্রধান ফটক শিকল দিয়ে তালাবদ্ধ রয়েছে। তবে সীমানাপ্রাচীরের কয়েক স্থান ভাঙা। সেখান দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, থানা চত্বরে রাখা বেশ কয়েকটি গাড়ি আগুনে পুরে ভস্মীভূত হয়ে পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের টহলকাজে ব্যবহৃত গাড়িও পুড়ে পড়ে রয়েছে। ভবনের নিচতলায় ওসির কক্ষসহ প্রায় প্রতিটি কক্ষ ভাঙচুর করা এবং আগুনে পোড়া।

ঘটনার পর থানার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত ৫ সেপ্টেম্বর পাশর্^বর্তী সিয়াম সুপার মার্কেটের তৃতীয়তলায় অস্থায়ীভাবে থানার কার্যক্রম শুরু করে হাইওয়ে পুলিশ।

জানতে চাইলে ইটাখোলা হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল খায়ের বলেন, থানা ভবনটি পুরোটাই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি সংস্কারে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমানে অস্থায়ী ভবন থেকে ২৮ জন সদস্য নিয়ে থানার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

একই চিত্র পাঁচদোনা পুলিশ ক্যাম্পের। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাঁচদোনা বাজারে পুলিশ ক্যাম্পটির অবস্থান। দোচালা টিনের ঘরের ক্যাম্পটির দরজা-জানালা ভেঙে ফেলা হয়েছে। আগুনে পুড়ে গেছে সব কক্ষ। ক্যাম্পের সামনে রাখা কয়েকটি গাড়ি আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে মাধবদী থানার ওসি মো. তছলিম উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্পটি সংস্কার করে অচিরেই চালু করা হবে। এখন থানা থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

শ্রীপুরে হাইওয়ে পুলিশের ভরসা একটি গাড়ি : হাইওয়ে পুলিশসেবায় এখনো গতিতে ফিরতে পারেনি। ফলে মহাসড়কে অরাজকতা আর অবৈধ যানবাহনের আধিপত্য বাড়ছে। বেড়েছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। একটু অন্ধকারে পড়লেই পথচারী মানুষ ভয় আর আতঙ্কে থাকে।

পথচারীদের অভিযোগ, নিয়মিত পুলিশ মহাসড়কে না থাকায় নানা অরাজকতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে লম্বা যানজটে পড়ে মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বেশ কিছু পয়েন্টে যানজট এখন নিয়মিত রূপ নিয়েছে।

তাদের দাবি, পুলিশ অফিস ভাড়া নিলেও মহাসড়কে অ্যাকটিভিটি নেই। আগে টহল থাকলেও এখন চোখে পড়ে না। চৌরাস্তাতেও পুলিশের উপস্থিতি খুবই নগণ্য।

এদিকে গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা হাইওয়ে থানা (মহাসড়ক পুলিশি কার্যক্রম) পুড়িয়ে ফেলার দেড় মাস পার হলেও থানা ভবন ও পুলিশ বক্সগুলো আর পুলিশ ফাঁড়িটি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। গাড়ি পুড়িয়ে ফেলায় পুলিশ পরিবহন সংকটে রয়েছে চরম আকারে। নিরুপায় হয়ে সম্প্রতি ভাড়া বাসায় সাময়িক কার্যক্রম চলাচ্ছে মাওনা হাইওয়ে থানা-পুলিশ। তবে সেখানে নামকাওয়াস্তে চলছে হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম। নানা সংকটের কারণে নিয়মিত কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

তবে হাইওয়ে পুলিশের দাবি, মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। এরই মধ্যে পুলিশ নিজস্ব গতিতে ফিরে এসেছে। নানা অভাব আর সংকটের পরও মানুষের সেবা নিশ্চিত করা ও মহাসড়কের শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। মহাসড়কে কোনো অপরাধ পেলে মামলা করা হচ্ছে নিয়মিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত আগস্টের শুরু দিকে কয়েক দফায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ হয়। এ সময় উত্তেজিত ছাত্র-জনতা মাওনা পুলিশ ফাঁড়ি, পুলিশ বক্স ও মাওনা হাইওয়ে থানা ভবনে আগুন দেয়। এতে পুলিশ ফাঁড়ির যাবতীয় আসবাব, কম্পিউটার, পোশাক, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নানা নথিপত্র পুড়ে যায়। অন্যদিকে উত্তেজিত ছাত্র-জনতার দেওয়া আগুনে মাওনা বকুলতলা এলাকা হাইওয়ে থানা ভবনে আগুন দিলে ভেতরে রাখা নিজস্ব ও জব্দ করা সব গাড়ি পুড়ে যায়। চারতলার থানা ভবনের প্রত্যেকটি কক্ষ ভেঙে তছনছ করা হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় সব জিনিসপত্র। এখন শুধু কঙ্কালসার চারতলা থানা ভবনটি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে নানা পোড়া ভস্ম ভগ্নাংশ।

অন্যদিকে উড়াল সেতুর দক্ষিণ মাথায় মহাসড়কের পশ্চিম পাশের পুলিশ ফাঁড়িটি এখনো অরক্ষিত ভস্মীভূত অবস্থায় পড়ে আছে। ঘরের দরজা-জানালা সব পুড়ে ছাই। ভাঙচুর আর পোড়ার ক্ষত নিয়ে পড়ে আছে ফাঁড়িটি। উড়াল সেতুর নিচে দুটি পুলিশ বক্স এখনো চালু করা যায়নি।

মাওনা হাইওয়ে থানার ওসি মাহবুব মোর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটি ভাড়া বাসা নিয়ে মাওনা হাইওয়ে থানা-পুলিশের কার্যক্রম করছি। এক মাস হলো ভাড়া বাসায় উঠেছি অফিস নিয়ে। এরই মধ্যে আমাদের সব পুলিশ সদস্য কাজে যোগ দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি রেকার ও একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নানা সংকট নিয়েই কাজ করছি। এখন একটি গাড়ি দিয়ে কাজ চালাচ্ছি কোনো মতে। একটি গাড়িই আমাদের ভরসা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের হাইওয়ে থানা ভবন, ফাঁড়ি অফিস ও পুলিশ বক্সগুলোর পুনর্নির্মাণকাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হবে। পরে নির্মাণকাজ শুরু হবে। এটি করতে সময় লাগবে। তবে নিয়মিত মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে এবং কোনো অপরাধ পেলে মামলা করছে।’

গাজীপুর হাইওয়ে পুলিশের রিজওনাল এসপি (অতিরিক্ত) সীমা রানী সরকার বলেন, ‘নানা সংকট আর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে। আশা করি, খুব দ্রুত সংকটগুলো কেটে যাবে। তাতে মানুষ আরও ভালো সেবা পাবে আমাদের কাছ থেকে। পুলিশ জনতার বন্ধু, এটি প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত