সুসান পোলগার আর রানী হামিদ। দুজনেই অসাধারণ নারী, দুর্দান্ত দাবা খেলোয়াড়। অবশ্য, সুসান একাধিকবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও কয়েকবার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হলেও রানী বিশ্বের সেরাদের কাতারে যেতে পারেননি। তবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিসংবাদিতভাবে সেরা এই দাবাড়– তাই বলে সম্মান কম পান না। জাতীয় পর্যায়ে অবিশ্বাস্যভাবে ২০ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর ১৯৮৪ সাল থেকে টানা দেশের হয়ে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া (তিনবার ওপেন টিমে) রানীর সঙ্গে ছবি তুলে সগর্বে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তা পোস্ট করেছেন। চলমান বুখারেস্ট অলিম্পিয়াডে রানী গর্ব করার মতোই অর্জন করেছেন।
৮০ বছর বয়সে দাবা অলিম্পিয়াডের মতো আসরে গিয়ে আসর মাত করা এই বাংলাদেশী নারী ৬টি ম্যাচের ৬টিতেই জিতেছেন। আর তাই সুসান তার সব অর্জনের পাশাপাশি মনে করিয়ে দেন রানী হামিদ দাবা খেলা শুরুই করেছিলেন ৩৪ বছর বয়সে। যেই বয়সে বহু দাবাড়– খেলা ছেড়ে দেন, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি ক্রমশ কমতে থাকার কারণে আগের মতো সাফল্য পান না অনেকেই। সুসান নিজেই ওই বয়সে নিজেকে বিশ্বসেরা প্রমাণ করে খেলা ছেড়ে মূলত দাবা শিক্ষক হিসেবে মনোযোগ দেন।
রানী হামিদ তাই দাবা জগতে একটা পরম বিস্ময়ই বটে। কীভাবে একজন গৃহবধূ পরিণত বয়সে দাবা শিখে প্রৌঢ়ত্বে গিয়েও সমানতালে মাত করে চলছেন তা আশ্চর্যের ব্যাপার। তবে সুসান আর রানীর ছবিটা কেবল সম্পূর্ণ দুই মেরুর দারুণ দুই নারীর গল্পই না, বরং মানুষের ইতিহাসে মেধা, প্রতিভা, সাফল্য ইত্যাদির এক দারুণ গল্প। আর এই গল্পে এই দুজনের পাশাপাশি আরেকজন কুশীলব লাসলো পোলগার, সুসানের বাবা। জুডিথেরও। যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাবা নিয়ে বিন্দুমাত্র খবর রাখেন তারা জানেন জুডিথ পোলগার কে। যারা জানেন না তাদের জন্য পরে আসছি।
লাসলো এক অদ্ভুত চরিত্র। কমিউনিস্ট হাঙ্গেরিতে জন্ম নেওয়া এই ইহুদি অতি অল্প বয়সে টের পান যে, মেধা ব্যাপারটা নিয়ে আসলে অতি বাড়াবাড়ি হয়, সাফল্যের একটাই সূত্র আর তা হচ্ছে সাধনা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা করা লাসলো সক্রেটিস থেকে আইনস্টাইন পর্যন্ত প্রায় চারশো মনীষীর জীবনী পড়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক নবজাতক শিশুকে ঠিকঠাক মতো বেড়ে তুললে সে জিনিয়াস হতে বাধ্য।
লাসলো কেবল তত্ত্ব দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি পিতা হওয়ার আগে রীতিমতো দীর্ঘ প্রস্তুতি নেন। বিদেশি ভাষার প্রশিক্ষক ইউক্রেনীয় নারী ক্লারার সঙ্গে বিয়ে করার আগে দীর্ঘ সব চিঠিতে জানান সন্তান জন্ম দেওয়ার পর পরই তারা দুজন মিলে কীভাবে তাদের বড় করবেন। তার মিশন ছিল বাচ্চাদের জিনিয়াস বানানো আর ক্লারা এই মিশনে সঙ্গী হন।
এরপর দুজন মিলে ঘটান মানুষের ইতিহাসে এক অন্যতম বিস্ময়কর পরীক্ষা। লাসলো-ক্লারা দম্পতি একে একে জন্ম দেন তিন কন্য সুসান, সোফিয়া আর জুডিথ। পূর্ব পরিকল্পনামতো এদের কাউকে প্রথাগত স্কুল বা বিদ্যাশিক্ষা দেওয়া হয়নি। তিনজনকেই বাবা-মা বাড়িতে বসে বেশ কয়েকটি বিদেশি ভাষা আর উচ্চপর্যায়ের গণিত শিক্ষা দেন। আর সবচেয়ে জোর দেন দাবায়। বড় মেয়ে সুসান দাবাকে ভালোবেসে ফেলায় তাতেই তাকে জিনিয়াস বানানোর সিদ্ধান্ত নেন পোলগার দম্পতি।
এর পরের গল্পটা সম্ভবত বিজ্ঞানের ইতিহাসে রূপকথা বলা যায়। যে যুগে মেয়েদের দাবা খেলার তেমন চল ছিল না, সে সময়েই সুসান শুধু মেয়েদের নয় অতি অল্প বয়স থেকেই ছেলেদের হারাতে থাকেন। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিলেন ছোট মেয়ে জুডিথ। মাত্র ১৫ বছর ৪ মাস বয়সে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে ববি ফিশারের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বরেকর্ড করেন, আর সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে মাত্র ১২ বছর বয়সে ফিদের সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের তালিকায় জায়গা করে নেন। একমাত্র নারী খেলোয়াড় হিসেবে সেরা দশে আসেন, ২৭০০ রেটিং পার হন এবং ১১ জন বর্তমান ও সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারান। জুডিথ তার বিজ্ঞানী বাবার এক্সপেরিমেন্টের দারুণ ফলাফল।
জুডিথ ৩৮ বছর বয়সেই দাবা থেকে অবসর নেন। আর এখানেই আবার চলে আসে রানী হামিদের গল্প, যিনি জুডিথের পিতা লাসলোর থেকেও বছর দুয়েকের বড়। নারী হিসেবে, ইহুদি হিসেবে জুডিথ আর সুসানকে অনেক ধরনের বাধা সইতে হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু মুসলিম পরিবারের স্ত্রী, মাতা আর রক্ষণশীল পরিবেশে রানী হামিদের তুলনায় সম্ভবত তা কিছুই না। অনেক বয়সে দাবার সঙ্গে পরিচয়ের কথা তো বলাই হলো।
ফলত, রানীর পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বদাবার প্রাক্তন সম্রাজ্ঞী সুসান গর্ববোধ করছেন সন্দেহ নেই এবং রানী হামিদের অনবদ্য সাফল্য যে কাউকে অনুপ্রাণিত করবে। তবে রানীর জেদ ও প্রতিভার গল্প সবাইকে নাড়া দিলেও শেষতক সম্ভবত বিজয়ী হন লাসলোই। লাসলোর একগাদা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফির পাশে আমাদের জন্য শুধু থাকে প্রেরণা আর ‘সঠিক পরিবেশে জন্মাইলে, সমর্থন পাইলে সম্রাজ্ঞী হইতেন আমাদের রানী’ এই আফসোসে।
কিন্তু, লাসলোর মতো অতটা বাড়াবাড়ি না করলেও, আমাদের সামগ্রিক পরিবেশ কি আসলেই রানীদের সমর্থন করে? পরিশ্রমের বদলে ‘প্রতিভা’ নামে অপরিমাপযোগ্য বিষয়ের প্রতিই কি আমাদের আগ্রহ বেশি নয়। সাধনার বদলে ‘চোখ ধাঁধানো জাদুর’ প্রতিই কি আমাদের আকর্ষণ গড়ে ওঠেনি? এর পেছনে মনস্বত্ত্ব খোঁজা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। কেউ কেউ আমাদের ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে দায়ী করেন, কেউ আমাদের নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশের আরামে অলস হয়ে যাওয়াকে দায় করেন, আরও অনেক কারণ খুঁজে পান। কিন্তু, আমাদের সমাজে ‘না পড়ে পাস করা’ ছাত্রকে এক ধরনের ‘জিনিয়াস’ আখ্যা দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে সাফল্য পাওয়াদের কিছুটা ছোট করার অভ্যাস আছেই, ব্রাত্য করার প্রবণতা আছে। যে কারণে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চরম অ-ধারাবাহিক আশরাফুল আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হন, ‘প্রতিভার ঝলকের’ কারণে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েও নিয়াজ মোর্শেদ বিশ্বসেরাদের কাতারে যাওয়ার লক্ষ্যস্থির করতে পারেন না। অথচ, নিয়াজের পরে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে বিশ্বসেরা হয়েছেন বিশ্বনাথন আনন্দ।
আর এই লেখাটা যখন লিখছি তখন অলিম্পিয়াডে ভারতের সেরা হওয়ার ব্যাপারটা প্রায় নিশ্চিত। আর মাস দুই পরে বিশ্বের সেরা দাবাড়– হওয়ার খেতাব পেতে লড়াই করবেন সে দেশের ১৮ বছরের দাবাড়– গুকেশ ডোম্মারাজু। রমেশ আর বৈশালী প্রজ্ঞানন্দের মতো অল্পবয়েসীরাও জোর লড়াই করবেন সামনের দিনে। আজকের দিনেই বাংলাদেশকে আরও একবার বড় ব্যবধানে হারানো ভারতের ক্রিকেট টিম প্রমাণ করেছে তারা কতটা এগিয়ে। এর পেছনে কেবল জনসংখ্যা, তথাকথিত প্রতিভার ঘাটতি নয় বরং বড় একটা কারণ আমাদের সংস্কৃতি। অধ্যবসায়ের বদলে জাদুতে বিশ্বাস।
রানী হামিদ আসলে এই ব্যবস্থায় একটা ব্যতিক্রম। চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যে আমাদের সমস্যাটা কোথায়। ফলে, রানী হামিদকে নিয়ে আমরা যদি গর্ব করি তা আসলে একান্তই ওনার নিজের। আর আমাদের রানী হামিদরা কেন সম্রাজ্ঞী হয়ে ওঠেন না তার সমস্যাটা অনেক গভীরে। আমাদের গভীরে যাওয়ার অভ্যাস নেই।
