সম্পদে লাগাম!

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০২ এএম

সরকারি কর্মচারীদের আয় নিয়ে কথা হচ্ছে দীর্ঘদিন। প্রাথমিক অবস্থায় তারা অর্থনৈতিকভাবে যে চেহারায় থাকেন, বছর না ঘুরতেই দেখা যায় সর্বক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন। কী এক অজানা (!) স্পর্শে অধিকাংশ মানুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেকে অন্যরকম ভাবেন। জীবনাচরণে এমন অদ্ভুত পরিবর্তনের কারণ আর কিছুই না অবৈধ আয়।

চাকরিবিধি অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের বিবরণ জমা দেওয়ার কথা ৫ বছর পর পর। সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাদের ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি করলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সেগুলো  দেখার কথা। কিন্তু এসব নিয়মকানুন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। যে কারণে সরকারি চাকরি এবং দুর্নীতি প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। গত জুলাই মাসের কথা। তখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী জমা  দেওয়ার আইনি বিধান মেনে চলতে উচ্চ আদালত আবার তাগিদ দিলেও আদেশ প্রতিপালন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান (সরকারি চাকরিজীবী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯ এর ১৩ ধারা) কঠোরভাবে প্রতিপালনের আদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। তখন সরকারের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার দুর্নীতির ঘটনা একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছিল। তার পরের ঘটনা সবার জানা।

বিভিন্ন সরকার থেকে অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি আর সহ্য করা হবে না। তারপর? এখন জানা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সম্পদ বিবরণী আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি অর্থবছরের সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে ব্যর্থ হলে অথবা কোনো ভুল তথ্য প্রদান কিংবা তথ্য গোপন করা হলে বা সম্পদের কোনোরূপ অসংগতি পরিলক্ষিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে চাকরি থেকে অপসারণের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। লঘুদণ্ডের মধ্যে প্রথমে রয়েছে তিরস্কার করা। এ ছাড়া চাকরির ক্ষেত্রে পদোন্নতি হবে না, আর্থিক ক্ষতি আদায় করা হবে। গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে পদ থেকে নিচে নামিয়ে দেওয়া, চাকরি থেকে বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর ও অপসারণের মতো পদক্ষেপ। এখন থেকে দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রতি বছর হিসাব দিতে হবে কড়ায়-গণ্ডায়। এই পটভূমিতে চলতি বছরের সম্পদ বিবরণী জমা  দেওয়ার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সরকারি কর্মচারীরা সর্বশেষ ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিজ নিজ সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছিলেন। জানা যাচ্ছে, সম্পদের তথ্য নিলেও তা কোনোভাবে প্রকাশ করবে না সরকার। এ  ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনেও জানা যাবে না কারোর সম্পদের হিসাব। বিদ্যমান জনবল দিয়ে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সম্পদের হিসাব যাচাই-বাছাই করা আদৌ কি সম্ভব? জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সংস্থার কাছে বারবার তাদের কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী চেয়েও সবার বিবরণী পায়নি।

মনে রাখা দরকার, দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না সামাজিক মূল্যবোধকেও দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদ অর্জন রোধে যথাযথ আইন প্রণয়নে বরাবরই পূর্বের সরকারের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। এবার কী হবে, সময়ই বলবে। প্রশ্ন হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধের উপায় কী? জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেছেন বছর বছর সম্পদ বিবরণী দেওয়া হলো, কর্মচারীদের জন্য একটা লাগাম। এবার কি লাগাম টানা হবে? যদি সম্ভব হয়, তাহলে বিষয়টি হবে নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত