রাজনীতিবিদ ও পরিবারের দ্বৈত নাগরিকত্ব

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:১০ এএম

জুলাই মাস দেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত এই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বিভিন্ন কারণে এ দেশের ইতিহাসের অন্য সব আন্দোলন থেকে আলাদা। এর অন্যতম কারণ হলো এই আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণ থাকলেও কোনোরকম রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছাড়াই গতি পেয়েছে এবং চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। দেশে যখন (জুলাই মাসের মাঝামাঝি) বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছিল এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা ছিল এ দেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদদের; সেটা ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী উভয় দলেরই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের তো দায় এড়ানোর কোনো সুযোগই নেই। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই হয়তো এই ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা এড়ানো যেত।

তবে সেটি না করে দেশের এমন ক্রান্তিকালে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীসহ অন্তত দুই ডজন এমপি দেশত্যাগ করেন। এমনকি সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) সরকার পতনের অনেক আগেই ১৫ জুলাই তার পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ লন্ডনের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পরিবর্তে এমন সময়ে দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সংসদ সদস্য (এমপি) ও জনপ্রতিনিধিদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ফ্যাসিবাদী সরকার উৎখাতের পরও মন্ত্রীসহ অনেক রাজনীতিবিদ জনগণের রোষের মুখে পড়ার ভয়ে উধাও হয়ে যান। অনেকে এখনো পলাতক, আবার কেউ কেউ আগেই পাড়ি জমিয়েছেন উন্নত কোনো দূর দেশে নিজের পরিবারের কাছে।

দেশের ক্রান্তিলগ্নে রাজনীতিবিদদের এমন ভূমিকা এবং পরিবারকে অন্য দেশে সেটেল করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানসিকতা সামনে এনেছে নৈতিক একটি প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করার সুযোগ থাকা উচিত? কেন রাজনীতিবিদ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের সুবিধা দেওয়া উচিত নয় তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে এবং পরবর্তী জাতীয় প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় জবাবদিহির মুখোমুখি না হয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদদের দেশত্যাগের হিড়িক দেখে মনে এ প্রশ্ন আসা খুবই যৌক্তিক। এছাড়া, যতদিন রাজনীতিবিদরা নিজের ও পরিবারের জন্য এমন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন, ততদিন রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক স্বার্থ ক্ষুণœ হয় এমন বেশ কিছু বিষয়ের উপযুক্ত ও সময়োপযোগী সমাধান সম্ভব হবে না।     

প্রথমত, যখন রাজনীতিবিদরা নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ বেড়ে যায়। যে কোনো বিপাকে দেশের মানুষকে পেছনে ফেলে এবং এমনকি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে পারব এমন সুবিধা রাজনীতিবিদদের মানসিকতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে; ফলে তারা হয়ে ওঠেন আরও বেশি উগ্র ও স্বার্থপর। গত শাসনামলে এমনটাই হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ নীরবে দেশ ছেড়ে চলে যান।

যে রাজনীতিবিদদের সংকট নিরসনে কাজ করার কথা তারাই কি না দেশ ও দেশবাসীকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে রেখে গেছেন। যখন সহিংসতা শুরু হয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নির্বিচারে ছাত্র-ছাত্রী ও আমজনতার ওপর পাখির মতো গুলি ছুড়ছিল, তখন আইনপ্রণেতারা আইনের শাসন নিশ্চিত করার দায়বদ্ধতা পাশ কাটিয়ে দূর দেশে নিজের পরিবারের কাছে নিরাপদে পাড়ি জমালেন। সংবিধানকে সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করা দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদরা রাতারাতি হয়ে গেলেন দেশান্তরী। এই ঘটনা এটি স্পষ্ট করে যে, ভবিষ্যতেও এ দেশের রাজনীতিবিদরা নিজের স্বার্থ হাসিল হয়ে গেলে দেশবাসীকে সংকটে ফেলে রেখে চলে যেতে দ্বিধাবোধ করবেন না।    

রাজনীতিবিদদের এমন সুবিধা থাকার কারণে ছাত্র আন্দোলনের সময় গণহত্যা চালানোর পেছনে যেসব ব্যক্তি কলকাঠি নেড়েছেন তাদের এখন ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা কঠিন। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তো আর ঐসব দেশ এই রাজনীতিবিদ বা এদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবার-পরিজনের কাউকে এদেশে ফেরত দেবে না।  

দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সুযোগ রাজনীতিবিদদের জন্য অবৈধ উপায়ে উপার্জন করা অর্থ পাচারের সুযোগও তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে লোটাস কামালের কথাই ধরুন। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত বেশকিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও তার মেয়ে নাফিসা কামালের বিরুদ্ধে ২৫ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে। তথ্য অনুযায়ী, লোটাস কামাল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দুবাইয়ে আবাসন খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থসম্পদ রয়েছে।  

এ ছাড়া, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদের পাহাড়ের কথাও আমরা জানি। আলজাজিরার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড সমমূল্যের কমপক্ষে ৩৫০টি সম্পত্তি কিনে রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নিশ্চয়ই তিনি আলাদিনের চেরাগ থেকে পাননি। দেশের অর্থ অন্য দেশে পাচার করে তিনি রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। অর্থ পাচার রোধ করতে যেখানে আইনপ্রণেতাদের আইন প্রণয়ন করার কথা, তা না করে আইনের ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে নিজেরাই অর্থপাচারে ব্যস্ত।     

তৃতীয়ত, রাজনীতিবিদদের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে, স্বার্থের গুরুতর দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) থেকে যায় এবং এটি সেই রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধির দেশের প্রতি আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ করার একটি বৈধ কারণ। দেশের যখন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হচ্ছিল, তখন অন্য দেশের কাছে ঋণের জন্য দ্বারস্থ হই আমরা। এ সুযোগে বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত রাজনীতিবিদরা প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে তাদের পরিবার ও পরিচিতজনদের জন্য নিশ্চিত করেছেন আইন-বহির্ভূত সুবিধা। হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন এবং সেই দুর্নীতির টাকা আবার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

একদিকে দেশের মানুষের কাঁধে ঋণের বোঝা বাড়ছে, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী শাসনের রাজনীতিবিদরা বিদেশে অর্থপাচার করেছেন। এই পাচারকৃত অর্থ অন্য দেশের অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করেছে; অথচ আমাদের নিজের দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। নিজের দেশের উন্নতি সাধনের পরিবর্তে রাজনীতিবিদরা অন্য দেশের উপকার করছেন। এই প্রবণতা রাজনীতিবিদদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য যথেষ্ট।

এমন প্রেক্ষাপট এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, রাজনীতিবিদ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের মতো সুযোগ সীমিত করার লক্ষ্যে আইনি কাঠামো নিয়ে চিন্তা করা উচিত। রাজনীতিবিদরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি; তাই তাদের উচিত নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে জনগণ ও দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। যেহেতু তারা সেটি করছেন না, তাই সময় এসেছে রাজনীতিবিদদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার। আর রাজনীতিবিদদের পরিবারের সদস্যদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব সুবিধা গ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ না করা গেলে এই জবাবদিহির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে না। কারণ দুর্নীতি করেন রাজনীতিবিদরা, কিন্তু এর সুফল ভোগ করেন পরিবারের সবাই মিলে। এমনকি অর্থ পাচারে বেশিরভাগ সময় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন অন্য দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া রাজনীতিবিদদের পরিবারের সদস্যরা। 

বাংলাদেশিরা এখন সবমিলিয়ে ১০১টি দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিতে পারেন। তবে, কিছু ক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিবিশেষে এই সুবিধা সীমিত করা উচিত। জনপ্রতিনিধি বা নির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা, সেই বিশেষ ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম। সর্বোপরি ওপরে উল্লিখিত কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে রাজনীতিবিদদের জন্যও এই সুবিধা বাতিল করা উচিত। এমনকি জনসাধারণ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দ্বৈত নাগরিকত্ব সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন কি না সেটি নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।

যতদিন এই সুবিধা থাকবে, ততদিন রাজনীতিবিদরা দেশের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করতে থাকবেন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের সম্ভাবনা রয়ে যাবে। মুহূর্তেই বিদেশের মাটিতে চলে যাওয়ার সুযোগ থাকলে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রবণতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করার মানসিকতা বন্ধ হবে না। পরিবর্তন আসুক এই নিয়মেও। দেশ যখন জনগণের টাকায় একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য এত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে, রাজনীতিবিদরা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য এতটুকু ত্যাগ তো করতেই পারেন। 

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত