আবরার তোফাজ্জল শামীম মুগ্ধ আর মউতের পিপাসা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:১১ এএম

পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে যাই কোনো এক কাশবনের পাশে। এখানে এখনো সকালের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। আমরা দূর থেকে দেখতে পাই চারজন বসে আছেন। তাদের কথা শোনার জন্য আমরা আরেকটু এগিয়ে যাই। আমরা দেখতে পাই, বসে আছে উলঙ্গ দুই তরুণ। আরেকটু দূরে ছেঁড়া শার্ট গায়ে বসে আছে আরেকজন। তার কাঁধে হাত রেখে বসে আছে চশমা পরা আরেকটি ছেলে। তাদের দিকে ক্রাচে ভর দিয়ে এগিয়ে আসছেন আরেক তরুণ।

আলো এখনো ফোটেনি, আমরা তাদের মুখ দেখতে পাই না। তবে তাদের আর্তনাদের চিৎকার, কণ্ঠ আমাদের পরিচিত; ফলে তাদের চিনতে কষ্ট হয় না। আমদের বুঝতে বাকি থাকে না, সেখানে বসে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত তোফাজ্জল হোসেন, জাহাঙ্গীরনগরের নিহত শামীম আহমেদ, পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ, বুয়েটের আবরার ফাহাদ এবং সেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে আসা তরুণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদ।

যে পথে হেঁটে এসেছি, সেই সড়ক বিভাজকে আমরা এতক্ষণ মাঝারি আকারের গাছ দেখতে পেয়েছি। আমরা আরেকটু এগিয়ে দেখতে পেলাম পিচঢালা রাস্তা শেষ হয়েছে। এখানে বড় বড় গাছ, নিচে পড়ে আছে ছোট ছোট পাতা। আমরা হাতে নিয়ে বুঝতে পারি এগুলো রেইনট্রিগাছের পাতা। পাঠক আমাদের যাত্রা এখানেই সাঙ্গ হোক। আমরা শুনতে চাই তারা কী বলেন। আরেকটু এগিয়ে আমরা আরেকটি রেইনট্রিগাছের নিচে বসি। সেখান থেকে হাত-বিশেক দূরে চারজন বসে আছেন। এখান থেকে তাদের কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। দূর থেকে হেঁটে আসা মাসুদ বলে ওঠেন, ভাই একটু পানি হবে?

মাসুদের এই কথা শুনে হেসে ওঠেন বিশ্বজিৎ। বলেন, শালা, এখানে ইয়ার্কি করতে আসছো? পানি মারাইতেছ আমাদের কাছে? আমরা মনে হয় পানি নিয়া বসছি!

মাসুদ বলেন, না ভাই; গলাটা শুকায়ে আছে কয়েক দিন ধরে।

বিশ্বজিৎ বলেন, মিয়া মরার আগে তুমি তো পানি চাওয়ার সময়টা পাইছিলা। আমি তো পানি চাওয়ার সময়ও পাই না।

ভাই দেখেন, আমি কিন্তু একবার-দুবার পানি চাই না। বিনোদপুর বাজার থেকে তুলে নিয়ে আমাকে যখন পেটানো শুরু করল, ভাবছিলাম, আমারে হয়তো কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেবে। কিন্তু না। আমি বারবার বললাম, আমার মেয়েটার ওষুধ নিতে আসছি ভাই, আমাকে ছেড়ে দেন। কিন্তু কোনো কথাই শুনল না। আমি নাকি ছাত্র মারছি। আরে ভাই, ২০১৪ সাল থেকে আমি পঙ্গু, আমি কেমনে আন্দোলনে যাই?

ধুর মিয়া তুমি থামো। এই বলে মাসুদকে থামিয়ে দেন বিশ্বজিৎ। নিজে বলা শুরু করেন, তোমার না হয় একটা পরিচয় আছে। আমি তো শালা কাপড় সেলাই করে দিন পার করতাম। আমি কী দোষ করেছিলাম, কও তো? কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তো আমারে কোপায়ে শেষ করে দিছে। আমি তো পানি চাওয়ার সময়টাও পাই নাই। আমি বারবার কইছি, ভাই আমি হিন্দু, আমি বিএনপি করি না। তারপরও আমারে মারল কেন? পরে দেখলাম এক রিকশাওয়ালা আমারে লইয়া হাসপাতালে যাইতেছে। আমি নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে দেখি, হাড্ডিগুড্ডি সব খুইলা গেছে, হরহর করে আমার বুকের ভেতর বাতাস ঢুকতেছে। একটু পানি চাইমু, গলা দিয়া শব্দই বের হয় না। হাসপাতালে যাওয়ার আগেই যে মইরা গেছি, হেইডা তো রিকশাওয়ালা বুঝতেই পারেন না। আচ্ছা মাসুদ কও তো, এই পানি না দেওয়ার কাহিনিটা কী?

আমিও বুঝি না ভাই। পিটায়ে মারবে ঠিক আছে। তাই বলে পানি দেবে না?

এবার যুক্ত হয় শামীম। বলে, হ; এইডা তো আমারও কথা! ভাই কী আর বলব বলেন, দিনদুপুরে আমারে পিটাইল। এক দিন আগে আমার কুত্তাডারে পিটায় মারছে। বন্ধু আমারে সাবধান করছে, ক্যাম্পাসে যাস না। কিন্তু আমি তো ক্যাম্পাসে না গিয়া পারি নাই... ক্যাম্পাস, আমার ক্যাম্পাস। আমার ক্যাম্পাসের ছোট ভাইয়েরা ওইখানে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে দেখল, কিন্তু কেউ কোনো কথাও কইল না। ক্যামনে কী ভাই?

আরে হ, একই ঘটনা তো আমারও। এই বলে খানিকটা চিৎকার করে ওঠে আবরার। বলে, ভাই সন্ধ্যার পর আমাকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর আমাকে মারা শুরু করে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে আমারে পেটায়। কিন্তু ঘটনা ওই একই। মারের সময় পানি দেয় না। আমাকে যখন মারছিল, মার মুখ বারবার মনে পড়ছিল। আমিও কথা বলতে পারছিলাম না। ইশারা-ইঙ্গিতে পানি চাইছি, কেউ দেয়নি। তবে তোফাজ্জল ভাইয়ের ভাগ্য ভালো। কী বলেন তোফাজ্জল ভাই?

কী কন ভাই? ভিডিও দেখে মনে হইতে পারে আমারে জামাই আদর করছে। কিন্তু আসলে তো তা না। প্রথমে পিটাইছে। এরপর খাওয়াইছে। আমারে তো খাওয়াইছে তরতাজা করার জন্য। এরপর কী করছে দেখছেন? আমার হাত মেঝেতে ফেলে বুট দিয়া পারাইছে। আর আপনাগোর মনে হচ্ছে, আমারে জামাই আদর করছে। এ রকম পিটন খাইলে কারও পানি পিপাসা পাবে না, এমনটা হয়? ওখানে কে শোনে কার কথা! একদল বলতেছে, মার কিন্তু মাইরা ফেলিস না। আরে ভাই, এমনে মারলে বাঁচা যায়!

আমরা দেখতে পাই, চারজনই ফুপিয়ে কাঁদছে। একে অন্যকে যখন জড়িয়ে ধরছে, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে। কাশবন সোনালি রঙ ধারণ করছে। শিরশির বাতাস বইছে আর চারজনের গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। শোনা যায়, দূর থেকে কেউ দৌড়ে আসছে আর বলছে, পানি লাগবে পানি?

লেখক : লেখক ও সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত