মালদ্বীপ-নেপালের পর শ্রীলঙ্কায়ও বামশক্তির বাজিমাত। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন মার্ক্সবাদী নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। আঞ্চলিক রাজনীতি-কূটনীতিতে আরেকটা ধাক্কা খেল ভারত। এ অঞ্চলে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল দেশটি। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক চিরবৈরী। মালদ্বীপে চীনপন্থি মোহাম্মদ মুইজ্জু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নেপালেও ভারতপ্রীতি নেই। আফগানিস্তানেও আম ও ছালা দুটোই তারা হারিয়েছে। এখন শ্রীলঙ্কায় চীনপন্থি দিশানায়েক। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণের ভেতর ভারতের সমালোচনা আরও দৃঢ় হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর বলেছেন, তার সরকার বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের জনগণের বন্ধুত্ব চায়। আবার যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথকে দিয়ে। অমিত শাহ চান উল্টো করে পিটিয়ে সোজা করতে। আচানক যত কথা। ভয় দেখিয়ে ভর করার চাণক্যনীতি যে এখন বিশ্বের কোথাও খাটে না ভারতকে একে একে নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীরা সবাই তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান কেপি শর্মা ওলির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আরেক বামপন্থি ভারতের জন্য কষ্টের সমান্তরাল হলেও, প্রতিবেশীদের জন্য বিষয়টি আশা জাগানিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের বামদের জন্য বাস্তবতাটা বড় নিদারুণ।
সত্তর এবং আশির দশকে শ্রীলঙ্কায় কমিউনিস্টরা দুবার অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অভ্যুত্থানে সামনে ছিল জেভিপি। সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান কয়েক হাজার পার্টি কমরেডসহ প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। পরবর্তী সময়ে সেই বিপ্লবী ধারার লড়াইয়ে কিছুটা কৌশলগত পরিবর্তন আনে তারা। দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের ব্যর্থতার পর থেকেই জেভিপি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিত্যাগ করে। এতে দলের মধ্যে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। জেভিপির ‘বিপ্লবী’ অংশ মনে করে, দলের বিপ্লবী প্রাণসত্তা ধ্বংস হয়েছে। দল বিভক্তির দিকে যেতে থাকে। ২০১৪ সালে জেভিপির নেতৃত্বে আসেন অনূঢ়া। দলের ‘হিংসাত্মক অতীত’ নিয়ে ক্ষমা চান তিনি। শুরু করেন ‘নতুনভাবে’ জেভিপি গড়ে তোলার চেষ্টা।
দলের ভেতরে তিনি সংশোধনবাদী হিসেবে সমালোচনা হলেও দলকে প্রান্তিক মানুষের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। দশ বছরের মধ্যে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার পথে ফল পাওয়া শুরু হয়। নির্বাচনের ফল প্রমাণ করছে, তিনি সফল হয়েছেন। ভারতের প্রতি অনূঢ়া ও তার দলের সুতীব্র রাজনৈতিক সমালোচনা বহু দশকের। মূলত চীন-ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত জেভিপি।
চার কিনারে এ অবস্থার মধ্যে এখনো বাংলাদেশে আলোচ্য, ট্যাগিং এবং পলিটিক্যাল বুলিংয়ের বিষয় ‘ভারতের দালাল’, ‘পাকিস্তানের দালাল’, ‘আওয়ামী লীগের দালাল’, ‘জামায়াতের দালাল’ ইত্যাদি। বামের কেউ না থাকার মধ্যেও আছেন বদরুদ্দীন উমর, ফরহাদ মজহার আর আনু মুহাম্মদ। তবে এই তালিকায় ফরহাদ মজহারের উপস্থিতিতে অনেকের দ্বিমত থাকলেও, তার আলাপ-আলোচনা বাম ধারাকে সঙ্গে করেই আগায়। তাদের এই থাকাকে পার্টি লাইনের ভেতর থেকে বিবেচনা করা জটিল তারা আছেন চিন্তক, বক্তা ও সমালোচক হিসেবে। বাকি বামরা শিখিয়ে দেওয়া কয়েক কথার তোতাপাখি। এতে বামপন্থিদের অবাক-হতবাক হওয়ার কিছু নেই। হতাশ হয়ে নেতিয়ে-চিতিয়ে পড়ার অবস্থাও হয়নি। বিধিলিপির মতো এত কিছু করেও জুলাই আন্দোলনের হিস্যা বা শরিকানা দাবি করতে পারেন তারা, জোরালোভাবেই।
এই জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা বা সমন্বয়কদের অনেকে প্রো-ইসলামিস্ট পরিচয় এখন আর তারা গোপন রাখছেন না। তারা প্রমোট করছেন জামায়াত-শিবির, চরমোনাই, হেফাজতকে। কিন্তু বাম ধারার তরুণদের অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো আলাপ নেই। বামদের অবদান যুগে যুগে এভাবেই হাইজ্যাক হয়ে যায়। নব্বইতেও হয়েছে মোটাদাগে। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যাবতীয় চিকন বুদ্ধি, কর্মসূচি, এমনকি সেøাগান ও দফা পর্যন্ত ছিল বামদের। এরশাদ পতনের পর সব কৃতিত্ব চলে গেছে বিএনপি-আওয়ামী লীগের ঘরে। এক অর্থে বাম নেতারাই তা ছেড়ে দিয়েছেন বড় দুই দলের উঠানে। কেউ কেউ তো আওয়ামী লীগ-বিএনপির পুকুর-দিঘিতে ডুব-সাঁতারসহ অজু-গোসলও সেরেছেন। হজ-ওমরাহতেও চলে গেছেন সরকারি খরচে।
মেরুদণ্ডহীনরা ধূর্ত হয়, নির্লজ্জ হয়। বাপ বদলাতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। মাঝখানে প্রাণ হারায়, আহত হয় হাজার ছাত্র-জনতা। আগে ছাত্রলীগ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এখন নতুন কেউ। আর বামেরা দীর্ঘদিন ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আওয়ামী লীগ’ লাইনে সরকারবিরোধী আন্দোলন-রাজনীতি করেছেন। ইনু-মেনন-দীলিপ বড়–য়ারা করেছেন আজান দিয়ে। বাকিরা চুপেচাপে। তাদের মনের গহিনের কথা : আওয়ামী লীগকে দিয়ে-নিয়েই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়নযোগ্য।
জুলাইয়ের এই আন্দোলন ছিল মজলুম বাংলাদেশি সব মানুষের মিলিত ফসল। এখানে বিএনপি, জামায়াত, চরমোনাই, হেফাজত, খেলাফত, বামপন্থি, ডানপন্থি, প্রবাসী কারোরই একক কোনো ক্রেডিট নেই। কিন্তু বামেদের বক্তব্যে বাম্পার ফলন থাকলেও ‘হক’ আদায় করতে পারছে না। সিপিবি, উদীচী, খেলাঘর লীগের বি-টিম হওয়ার আর বাকি রাখেনি। অথচ সিপিবি আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোরতর বিরোধী ভূমিকা রেখেছে। উচিত কথা বলতে ছাড়েনি। তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের ছয়জন নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছে এ আন্দোলনে। তাদের মৃত্যু-পরবর্তী কোনো শোকসভাও তারা করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর নেই।
এরপরও আমাদের বামদের একদম হতাশ হয়ে তল্পিতল্পা নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ার অবস্থা হয়নি। পাঠ পঠনের জন্য নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার দিকে তারা তাকাতেই পারেন। রাজাপাকসে পরিবার প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৫ বছরের বেশি শাসনক্ষমতা ধরে রেখেছিল। শ্রীলঙ্কাকে সেই অস্বস্তি থেকে মুক্ত করার জন্য ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক নেতাদের আর বিশ্বাস করা যায় না। তাই দুর্নীতির সংস্কৃতির মূলোৎপাটনে প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা প্রার্থী ভোটারদের কাছে খুব আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন। ৫৫ বছর বয়সী অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার-এনপিপি এর আগে এমনকি বিরোধী দলেও ছিল না। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের পরিচিত মুখ। নমাল রাজাপাকসে, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের বড় ছেলে। সজিথ প্রেমাদাসা, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার ছেলে। আর সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে, দেশের প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট জে আর জয়াবর্ধনের ভাগনে। তাদের পেছনে ফেলে দাঁড়িয়ে গেলেন জেভিপির অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে।
শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক বাঁকবদল হয় ২০২২ সালে। দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, দেখা দেয় আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি। শুরু হয় গণবিক্ষোভ। সিংহলি ভাষায় যার নাম আরাগালাইয়া, মানে সংগ্রাম। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে বাধ্য হন পদত্যাগ করতে। এর আগে তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দাও পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। দুই ভাই ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেন। আরাগালায়া আন্দোলনের নেতৃত্ব এককভাবে কোনো দল দাবি করেনি। জেভিপি এতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। রাজাপাকসে ভাইদের পদত্যাগের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতায় দিশানায়েকে এবং জেভিপি বৃহত্তর পরিবর্তনের ডাক দেয়। সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অনড় অবস্থান নাগরিকদের আকৃষ্ট করেছে। প্রান্ত থেকে দলটি একটি আস্থাভাজন প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ-কর্র্তৃত্ববাদ খেদিয়ে বাংলাদেশ সবে একটি সিঁড়ির সন্ধিক্ষণে পা দিয়েছে। সেখানে আন্দোলনের কৃতিত্ব, বিচারের আগে বিচার মানে মব জাস্টিসের এক কদাকার চেহারা দেখা দিচ্ছে। আর বিগত রেজিমের পালানোর দৌড়ে ফার্স্ট হওয়ার প্রতিযোগিতা। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মুয়াজ্জিন-ইমাম-খতিব, সাংবাদিক, উকিল, শিক্ষক মিলিয়ে দৌড়ের এক সার্কাস। রীতিমতো ক্ষুরের ওপরে হাঁটছে গোটা জাতি। খুব বিভ্রান্তিকর সময়। নৈরাজ্য চূড়ান্ত পর্যায়ে। যে যেখান দিয়ে যা পারছে কাণ্ড ঘটিয়ে দিচ্ছে। এক বর্বরতার পর আরেক বর্বরতা। এ বীভৎসতা থেকে কে কাকে বাঁচাবে? নমুনা কিছুটা উমাইয়াদের উৎখাত করে আব্বাসীয়দের আরব সাম্রাজ্যের দখল নেওয়ার মতো। উমাইয়া বংশের যাকে যেখানে পাওয়া সেখানেই পিটুনি।
এ অবস্থার বিপরীতে অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য বামপন্থিদের প্রকাশ্যে তওবা না হোক, রাস্তায় নামার সুযোগ তো আছে। নিশ্চয়ই কর্মসূচি দিয়ে নামলে বাধা আসবে না। কাদের, কামাল, বেনজীর, হারুন বাহিনী দমনে নামবে না। ইনু-মেনুর দোসরও কেউ আসবে না। বামবিরোধীদের নানা সমালোচনা থাকলেও তারা পড়াশোনা করেন বলে প্রশংসা আছে এখনো। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। সুযোগ পেলে যে কোনো অনানুষ্ঠানিক ফোরামেও আলোচনা করেন। এই অব্যাহত জ্ঞানচর্চার কারণে কোনো ঘটনাকে একতরফা দৃষ্টিতে না দেখে নানা দিক থেকে আলো ফেলে দেখার চেষ্টা করতে পারেন তারা। অন্তত, উমর-মজহার-আনুদের ডাকতে পারেন তারা। ঘটে যাওয়া বিপ্লবের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ উদঘাটনের অন্তত শুরুটা তো করতে পারেন।
কে না উপলব্ধি করছেন ৫ আগস্টের পর থেকে বিপ্লবের সুফল হাইজ্যাকের নানা রকমফের। যে যেভাবে পারছেন করছেন। কিচ্ছা বানাচ্ছেন। পারলে বাহাত্তর সালের মতো মুক্তিযুদ্ধের জাল সনদ তৈরির প্রজেক্টও নিচ্ছেন। ছাত্রদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বিভিন্ন বিবৃতি ও
বক্তৃতা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। অথচ এই দেড় মাসে বিপ্লবের বিরুদ্ধে কয়েকটি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে হয়েছে ছাত্রদের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট বলেছিলেন: বিজয়ীরা সমাধান খোঁজে, পরাজিতরা করে ছল। দেখায় নানা যুক্তি। কী কারণে, কাদের সহায়তায়, কোন সৃষ্ট অবস্থায় শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেন, নানা চাতুরীতে টিকে থাকলেনসেইসব নথিপত্র কই? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণে ফ্যাসিস্ট ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়েছে। তাই ছাত্রদের এই পরিকল্পিত অভ্যুত্থান ছাড়া ফ্যাসিস্টকে উৎক্ষাত করার আর কোনো উপায় ছিল না। ফ্যাসিস্টের পুনরুত্থান রোধ করার দায়িত্ব নেবে কে? বাম আর ডান যে এখানে এগিয়ে থাকবে, তার জন্য বাংলাদেশের আগামীর পথরেখা পরিষ্কার।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
