শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন দেশটির বামপন্থি রাজনীতিবিদ অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। ৫৫ বছর বয়সী এই নেতা গতকাল সোমবার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে একটি ইতিহাসও রচনা করেছেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তার হাত ধরেই শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে প্রথমবার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এলো বামপন্থিরা। অনূঢ়া কুমারার জয় চমক সৃষ্টি করলেও, খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২২ সালে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল শ্রীলঙ্কা। তখন ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন দিশানায়েকে। নতুন শ্রীলঙ্কার বিনির্মাণে তার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে চরম অর্থনৈতিক সংকটের পর কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের দাবি জানানো সাধারণ শ্রীলঙ্কানদের ওপর।
দেশটির সবশেষ নির্বাচনেও অনূঢ়া কুমারার জনপ্রিয়তা ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। দেশটির ২২৫ সদস্যের পার্লামেন্টে এই জোটের আসন ছিল মাত্র তিনটি। তবে দুই বছর আগের গণবিক্ষোভ বদলে দেয় পটভূমি। সেই গণবিক্ষোভে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তার দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনার। আন্দোলনের পর বৃহত্তর পরিবর্তনের ডাক দেয় জেভিপি। সামাজিক সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলটির অনড় অবস্থান নাগরিকদের আকৃষ্ট করেছে। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অনূঢ়ার জনপ্রিয়তাও। যার স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে নির্বাচনের ফলাফলে।
নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে প্রথম বামপন্থি হিসেবে প্রেসিডেন্টের মসনদে বসলেন অনূঢ়া কুমারা। ১৯৬৮ সালের ২৪ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলীয় গালেওয়ালা শহরে জন্ম তার। ১৯৮৭ সালে ইন্দো-শ্রীলঙ্কা সমঝোতা চুক্তির সময়কালে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। সেই চুক্তিটি কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কার অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষগুলোর একটি শুরু হয়েছিল। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বামপন্থি রাজনৈতিক দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনা শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে দানা বাঁধা অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিদ্রোহ দ্রুতই রূপ নেয় সংঘাতে। সরকারের গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, অপহরণের মুখে পড়ে বিদ্রোহীরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নিপীড়নের দলটির প্রতিষ্ঠাতা রোহানা উইজেবিরা, বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ নেতাসহ কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ নিহত হয়। মার্কসবাদে অনুপ্রাণিত দলটি গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে দুটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সহিংসতার পথ ত্যাগ করে জেভিপি। ১৯৯৭ সালে জেভিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পান অনূঢ়া। ২০০৮ সালে তিনি দলটির নেতা নির্বাচিত হন।
সে সময় থেকেই ভিন্ন এক রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হন অনূঢ়া কুমারা। এমনকি তার দলের সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন বিভিন্ন সময়। নেতা হিসেবে তার স্পষ্টবাদিতা ও স্বচ্ছ অবস্থানের কারণে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি কাঠামোগত দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক দায়মুক্তির বিষয়গুলো কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা জন্মায় দেশটির জনগণের মধ্যে। জনগণের সে চাওয়াকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন অনূঢ়া। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি থেকে উত্তরণ এবং নিজেকে পরিবর্তনের পক্ষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তিনি।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে অনূঢ়া হয়ে উঠেছেন দরিদ্রদের প্রতিনিধি। মূলত অনূঢ়ার জনবান্ধব নীতি ও কর কমানোর অঙ্গীকার নির্বাচনে তাকে জনপ্রিয়তার চূড়ায় নিয়ে যায়। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে রণিল বিক্রমাসিংহের সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও, কর বৃদ্ধি-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা বিষয়ে অসন্তোষ ছিল শ্রীলঙ্কানদের। তাই সাধারণ মানুষ ভিন্নধারা রাজনৈতিক নেতার দিকে ঝুঁকেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারের গতিপথ ঠিক করা, শাসনব্যবস্থার প্রতি দেশের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ অনূঢ়া কুমারার সামনে। অর্থনৈতিক সংকট সামলানোর প্রক্রিয়ায় থাকা শ্রীলঙ্কাকে কক্ষপথে রাখাই হবে নতুন প্রেসিডেন্টের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে অনূঢ়া কুমারার রাজনৈতিক দর্শন শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারের পথকে ব্যাহত করতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশটির অর্থনীতি ও বাজার বিশ্লেষকরা। তবে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা তৈরির মাধ্যমে জনগণের আস্থার প্রতিদান দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, সেটির বাস্তবায়ন করতে পারলে পুনর্গঠনের পথে অনেকটাই এগিয়ে যাবেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে, সেটি তো বলাই যায়।
