২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গুমের অভিযোগ তদন্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন শাখায় আবেদন করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যবসায়ী এনামুল কবিরকে ১০ দিন গুম রাখার অভিযোগ এনে গতকাল সোমবার এ অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নিজে। এতে শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের নাম উল্লেখ করেছেন।
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত শাখায় গতকাল পর্যন্ত অন্তত ৩০টি অভিযোগ দাখিল করেছেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে গুমের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গতকাল প্রথম এ অভিযোগটি দায়ের হলো। দুপুরে এ বিষয়ে বিস্তারিত সাংবাদিকদের জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা তার অভিযোগটি যাচাই করে দেখব। তিরি আরও জানান, ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর এনামুল কবিরকে তার বাসাবোর ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। তৎকালীন ডিবির অফিসার মশিউরের নির্দেশে তাকে চোখ বন্ধ করে হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হয়। ডিবি কার্যালয়ে এনামুল কবিরকে হাত-পায়ের মাঝখানে লাঠি ঢুকিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। তাকে নির্যাতন করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের তথ্য জানতে চায় ডিবি। পরে ২৬ নভেম্বর তার অফিস থেকে এক বস্তা বিস্ফোরক সদৃশ বস্তু উদ্ধার হয়েছে এই মর্মে তার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা হয়। ওই মামলায় অনেক দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিন পান।
তাজুল ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত বেআইনিভাবে এনামুল কবিরকে গোপন কারাগারে অর্থাৎ ডিবি অফিসে আটকে রাখা হয়। এ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তদানীন্তন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রী এবং যাদের নির্দেশে পরিকল্পিতভাবে সারা দেশব্যাপী এ ধরনের গুমের ঘটনাগুলো ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগটি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী এনামুল কবির ২০০৯ সাল থেকে গুমের সবকটি ঘটনার বিচার চেয়েছেন। আমরা এখন এটি যাচাই-বাছাই করে দেখব।
সাভারে ইয়ামিন হত্যায় অভিযোগ: সাভারে গুলির পর পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে সড়কে ফেলে দিয়ে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন হত্যার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৮ জনের নাম উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়েছে। গতকাল ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় এ অভিযোগ জমা দেন নিহতের মামা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুন কাদির। তার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সাকিল আহমাদ। অভিযোগে বলা হয়, গত ১৮ জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সম্মিলিতভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে। তারা ইয়ামিনকে ধরে টেনে পুলিশের সাঁজোয়া যানের কাছে নিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে বুকের বামপাশে গুলি করে। গুলিতে ইয়ামিনের বুকের বামপাশে অসংখ্য গুলির স্পিøান্টার বিদ্ধ হয়। এমন অবস্থায় দায়িত্বরত পুলিশরা ইয়ামিনকে টেনে পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর ফেলে রেখে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য গাড়িটি এপাশ থেকে ওপাশ প্রদক্ষিণ করে ইয়ামিনকে প্রায় মৃত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা ধরাধরি করে উঁচু রোড ডিভাইডারের একপাশ থেকে আরেকপাশে ইয়ামিনকে ছুড়ে ফেলেন। পরে ইয়ামিনকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নারায়ণগঞ্জে কিশোর আরাফাত হত্যায় শেখ হাসিনাসহ আসামি ১৫৮ জন: নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়ে কিশোর মো. আরাফাত হোসেন আকাশ (১৬) নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে মামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আল মামুন। এর আগে রবিবার নিহত আরাফাতের বাবা মো. আকরাম বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান, নাসিক ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি, ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইফতেখার হোসেন খোকন, ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লা এবং ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ারুল ইসলাম।
