বাংলাদেশের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর পূর্ণ সমর্থন জানান। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যে বৈঠকটি হয়।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের এটি প্রথম বৈঠক।
বৈঠকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ ছিল ভারত প্রসঙ্গও। তবে ভারত নিয়ে আলোচনার কী ছিল তার সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ করা ও কোটামুক্ত সুবিধা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। ৫ শতাংশ না হলেও অন্তত ভিয়েতনামের (৭ শতাংশ) সমান দাবি করেছে বাংলাদেশ।
এদিকে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের কূটনীতিক ও প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী সূত্রে জানা গেছে, বৈঠক সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৯টায় গ্রাউন্ড হায়াত হোটেলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে জাতিসংঘ মহাসচিবের সংবর্ধনায় যোগ দেন ড. ইউনূস। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হয়, যেখানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগদানকারী বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানান সংস্থাটির মহাসচিব। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূস ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, মরিশাসের প্রেসিডেন্ট পৃথ্বিরাজ সিং রূপন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সম্পর্কিত হাইকমিশনার ভলকার টুর্কসহ অন্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে কূটনীতিক সূত্রে আরও জানা গেছে, অন্তর্র্বর্তী সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতন ও দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অন্তর্র্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে পাশে থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার কথা জানিয়েছে দেশটি। এ ছাড়া বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কারে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে সহযোগিতাসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে বাইডেনের সমর্থন চান নোবলেজয়ী ইউনূস।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় বাজার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হার বেশি। এতে বাংলাদেশ বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার। ভিয়েতনাম মাত্র ৭ শতাংশ শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। অথচ বাংলাদেশকে ১৮ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মার্কিনবিরোধী পররাষ্ট্রনীতির কারণে এতদিন যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক হার কমায়নি। তবে শেখ হাসিনা শুল্ক কমানো ও কোটামুক্ত সুবিধার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার অনুরোধ জানিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে হওয়া বৈঠকে কী কথা হয়, তা জানতে বিশ্বনেতারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত এ বৈঠককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য নিয়ে দেশটি শঙ্কিত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন মেরূকরণে ভারত খুবই চিন্তিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশি অধ্যাপক শওকত আলী গণমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি হারিয়েছি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন ৬০ শতাংশ তৈরি পোশাক ভারত থেকে আমদানি করে। ভিয়েতনাম যেখানে ৭ শতাংশ শুল্কে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে, আমাদের সেখানে দিতে হয় ১৮ শতাংশ। এটা চরম বৈষম্য। আমরা আশা করব বাইডেন-ইউনূসের বৈঠক জিএসপি ফেরত এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি ফিরে পাওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
২৭ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেবেন ইউনূস : নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তিনি বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে বিস্তারিত তুলে ধরবেন। তার নেওয়া নানা পদক্ষেপের বর্ণনাও দেবেন তিনি। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারে গঠিত কমিশনের বিষয়টিও তুলে ধরবেন। আগামী দিনে জনভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও জনস্বার্থে নিবেদিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় বিশ্বদরবারে তুলে ধরবেন ইউনূস। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, বিশ্বব্যাপী সংঘাত, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিকূলতা, উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, নিরাপদ অভিবাসন, অভিবাসীদের মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির টেকসই হস্তান্তর এবং ফিলিস্তিন সম্পর্কিত বিষয়গুলো তার বক্তব্যে স্থান পাবে। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের বক্তব্যে গাজায় ইসরায়েলি হামলা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও সুদানে জাতিগত সংঘাতের বিষয়ও থাকবে।
বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য, শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ডাচ প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, নেপালের প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘ মানবাধিকার সম্পর্কিত হাইকমিশনার, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট এবং ইউএসএইডের প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ইতালির প্রেসিডেন্ট এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গেও বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন বলেছেন, এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, প্রধান উপদেষ্টার পরিচিতি এবং সুনাম বিশ্বব্যাপী। এ কারণে অনেক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সভায় অংশগ্রহণের জন্যও অনুরোধ এসেছে। যেহেতু তিনি মাত্র তিন দিন নিউ ইয়র্কে অবস্থান করবেন, সেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ স্বল্প সময়ের মধ্যে সবার অনুরোধ রক্ষা করা বেশ কঠিন।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি : সোমবার নিউ ইয়র্ক সময় রাত ১০টা ১০ মিনিটে কাতার এয়ারওয়েজের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে তিনি নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। প্রধান উপদেষ্টার আগমন উপলক্ষে বিমানবন্দরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
এদিন সন্ধ্যা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিমানবন্দরের বাইরে জড়ো হয়ে অধ্যাপক ইউনূসকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। একই সময় বিমানবন্দরের আরেক পাশে অবস্থান নেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা, তারা বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার আগমনের প্রতিবাদ জানান। ফলে পুরো টার্মিনাল এলাকা পক্ষে-বিপক্ষে নানা সেøাগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। বিমানবন্দরের দুই গ্রুপ কাছাকাছি অবস্থান করে সমাবেশ করলেও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এ সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মুহাম্মদ আবদুল মুহিত ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ডিএম সালাউদ্দিন মাহমুদ বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। সেখান থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাকে ম্যানহাটনের অভিজাত একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে প্রধান উপদেষ্টার বহনকারী ফ্লাইটটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সোমবার ভোর ৫টায় উড্ডয়ন করে।
