এই সংকট সাময়িক

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৪৪ এএম

গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশের অনেক জায়গায় বিঘ্নিত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে, অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় স্বাভাবিক হবে। মনে রাখতে হবে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দেশব্যাপী লোডশেডিং বেড়েছে। বেশি লোডশেডিং দেখা দিয়েছে গ্রামাঞ্চলে। ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদন কমেছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। অল্প সময়ের মধ্যেই এ রকম সমস্যা থাকবে না। স্বাভাবিক হয়ে যাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং এর কনজামশন নির্বিঘ্ন রাখতে আমাদেরও কিছু করার আছে। 

জ্বালানি আমদানিনির্ভর এই খাতে বেসরকারি বিদু্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া বাড়ছে। চাহিদা মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সরকার অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় রেখে গেছে তারই ফলশ্রুতিতে এই খাত সাময়িক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

অন্তর্র্বর্তী সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই খাতে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। সম্পূর্ণ টাকা দেওয়া সম্ভব না হলেও যতটুকু দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায় ততটুকু দিতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতে পলিসিগত যে ভুল সবচেয়ে ভয়াবহ হয়েছে সেটা হলো, পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালী অর্থনীতির বিবেচনায় আমদানিনির্ভর করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার অর্থনীতির একটি ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গ্যাসের পাশাপাশি তেল ও কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানির বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যদিও বিদ্যুৎ-গ্যাসে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তবে তা এটা সাময়িক। সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা বর্তমান সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারব। তবে এর জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সমস্যা কি প্রকট আকার ধারণ করতে পারে? আমি ব্যক্তিগতভাবে তা মনে করি না। তবে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের অভ্যাস এবং চরিত্রে।

সংকট থাকবে, কিন্তু তার সমাধানও আছে। একটা বিষয় গভীরভাবে ভাবতে হবে, বর্তমানে বিদ্যুৎ সমস্যার আসলে কী কারণ? আমরা একটু সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে পারি।

বর্তমানে এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। আমাদের কনজামশন বেড়েছে। অনেক মিসইউজ হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত রিকশায় ছেয়ে গেছে পুরো দেশ। প্রতিটি জেলার মহল্লা, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও এই যে এসব রিকশা চলছে, প্রতিদিন এর পেছনে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে? এসব কিন্তু চার্জ করা হচ্ছে অধিকাংশই অবৈধভাবে। আবার যদি অবৈধ নাও হয়, দেখা যাবে হাউজহোল্ড কানেকশন থেকে এসব করা হচ্ছে। লক্ষ করার বিষয়, সরকার কিন্তু এখানে কমার্শিয়াল কোনো অর্থ পাচ্ছে না। 

আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর যে ইনস্টল ক্যাপাসিটি, সেই অনুযায়ী জেনারেশন হচ্ছে না। অধিকাংশ পাওয়ার প্ল্যান্টের বেশ কয়েকটি ইউনিট নষ্ট বা বন্ধ থাকে। ফলে জেনারেশনের পরিমাণ কম। বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ পাওয়ার প্ল্যান্টে রয়েছে পুরনো যন্ত্রপাতি। সে কারণে ইফেক্টিভ রেটিংটাও আর থাকছে না। পুরনো মেশিনের কারণে ডিরেটিং হয়ে, প্রকৃত জেনারেশন ক্যাপাসিটি কমে যায়। বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। তার মানে এই নয় যে, আমরা অন্ধকারে নিমজ্জিত হব। সাময়িক সমস্যা হতে পারে, তবে অচিরেই সমাধান হবে।

বিগত সরকারকে এনার্জি সেভিংয়ের জন্য অনেকে এক ধরনের কনসেপ্ট দিয়েছেলেন। বলেছিলেন, এলইডি লাইট অথবা এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করার জন্য। এরপর অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণে তা ব্যবহার করছেন। লক্ষ করার বিষয়, দেশব্যাপী কিন্তু এর কোনো মোটিভেশন ছিল না। দেশের মানুষ শুধু জানত, এ ধরনের লাইট ব্যবহারের ফলে বিদ্যুতের সাশ্রয় হয়। যে কারণে কোনো শপিংমল বা দোকানে এসব ঝলমলে বাতি এখনো বিপুল পরিমাণে জ¦লছে। এক্ষেত্রে বিগত সরকার কমার্শিয়াল প্লেসে বিজনেস নেচার ও শোরুমের সাইজ অনুযায়ী বিদ্যুতের লুমেন (আলোর একক) ঠিক করে দিতে পারত। অথচ তা করা হয়নি। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে ভাবতে পারে। কাউকে যদি বলা হয়, এত লাইটের কী দরকার? তখন তারা বলে, এসব তো এনার্জি লাইট! কিন্তু তারা জানে না, এনার্জি লাইট হলেও এর একটা কনজামশন পাওয়ার রয়েছে। ফলে কনজামশন কিন্তু বাড়ছে। এখানে সরকারের অনেক সুযোগ রয়েছে মোটিভেশন দেওয়ার। খুব সহজেই দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করা যায়।

আসলে প্রত্যেকটা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ঠিকমতো জেনারেশন হচ্ছে না। তার ওপর রয়েছে সিস্টেম লস। আবার সচেতনতা না থাকার কারণে আমাদের কনজামশন বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতে তার প্রভাব পড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি কঠোর নিয়ম থাকত যারা এমন করবে তারা কেবল নিজের পাওয়ার প্ল্যান্ট বা জেনারেটর থেকে পাওয়া বিদ্যুতের যথেচ্ছা ব্যবহার করতে পারবে, এখানে সরকারের কোনো লাইন থাকবে না তখনই তার অপচয় এবং ব্যবহার কমে আসবে। আমাদের দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার দরকার নেই। প্রথম কথা হচ্ছে, বাড়তি ব্যবহার কমাতে হবে। অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে বন্ধ বা সাময়িক স্থগিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করলে সমস্যা থাকার কথা নয়।

সামনেই শীতকাল শুরু হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখন বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতেই কমে আসবে। ফলে নভেম্বর মাস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিদ্যুৎ-গ্যাসে এখন যে সমস্যা উঁকি দিচ্ছে, তা সাময়িক। এটাকে স্থির ধরার কোনো কারণ নেই। আমরা এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পারব। অচিরেই একটা পজিটিভ সমাধান আসবে। শুধু দরকার সরকারের নির্দিষ্ট কিছু জনবান্ধব পরিকল্পনা। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটা জনমতামতের ব্যবস্থা করা দরকার। দ্রুত অলটারনেটিভ সোর্স বের করতে হবে। এটি করতে পারলে এই সমস্যা নিয়ে ভবিষতে তেমন কথা হবে না। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আত্মনির্ভর টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়নের পথ ধরা ছাড়া আপাতত কোনো বিকল্প নেই। টেকসই জ্বালানি নীতিই পারে আতঙ্কিত হওয়ার পথ চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার। এই সমস্যাকে সাময়িক ধরে সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়াই আধুনিকতা।

লেখক: প্রকৌশলী, ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত