ক্ষতবিক্ষত স্বাধীনতার সূতিকাগারে নীরবতা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:১৮ এএম

স্বাধীনতার সূতিকাগার ঐতিহাসিক মুজিবনগর কমপ্লেক্সে এখন সুনসান নীরবতা। একসময় পর্যটকদের পদচারণে মুখরিত হওয়া মুজিবনগরের আম্রকানন এখন জনমানবহীন। শুধু ৬০০ ভাস্কর্য এক মাসের বেশি সময় ধরেই নানা ক্ষত ও আঘাত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। কোনোটির হাত নেই, কোনোটির নেই পা। আবার কোনোটির মাথা ভেঙে পড়ে আছে। কোনোটির ভেঙেছে নাক, কোনোটির শরীরের অন্য অঙ্গ। আর চারদিকে ৫ আগস্ট বিকেলের ধ্বংসযজ্ঞের ছড়ানো-ছিটানো ক্ষতচিহ্ন।

এক মাসের বেশি সময় পরেও হামলার ঘটনায় কোনো মামলা না হওয়া, সেগুলো সংস্কার বা সরিয়ে ফেলার কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। অবশ্য পুলিশ বলছে, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ না থাকায় তারাও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। আর উপজেলা প্রশাসনও বলছে, তাদের আসলে জানা নেই কী করতে হবে। তবে সম্প্রতি সেখানে পরিদর্শনে যাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন রাজ বলেছেন, তিনি মুজিবনগরের হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাবেন। পাশাপাশি স্বাধীনতার ইতিহাস আর যেন কেউ মুছে ফেলতে না পারে, সেদিকেও সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আনসার ব্যাটালিয়নের অর্ধশত সদস্য। চতুর্দিকে আছে সিসি ক্যামেরা।

আনসার সদস্যরা বললেন, ৫ আগস্ট বিকেলে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ লোহার বড়, লাঠিসোঁটা নিয়ে চড়াও হয় মুজিবনগর কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকের ওপর। হামলাকারীরা তালাবদ্ধ ফটক খুলে ভেতরে প্রবেশ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগাথা ভাস্কর্যগুলো একে একে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। প্রথমেই তারা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ভাস্কর্যের ওপর আঘাত করে ভেঙে ফেলে। আনসার সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিলে তারা সব গেট খুলে নিজেদের রক্ষা করতেই নিরাপদ অবস্থানে চলে যায়। এরপর শুরু হয় ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ। সেখানে ৬৫০ ভাস্কর্য নষ্ট করা হয়।

দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত করে তুলে ধরতে মুজিবনগরে ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সবচেয়ে বেশি ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপস্থাপনও। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দেশের বৃহৎ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধের চিত্র, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, মুজিবনগরে প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ, গার্ড অব অনার, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ চুক্তি, তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের গোপন বৈঠক, মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি ও নারীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি, শরণার্থী গমন, সেক্টর অনুযায়ী যুদ্ধসহ মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক চিত্র, যেগুলো ভাস্কর্য আকারে ফুটিয়ে তোলা ছিল, তার কোনোটিই অক্ষত নেই।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, কিন্তু ওইদিন (৫ আগস্ট) সেগুলো রক্ষা করতে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের কোনো উদ্যোগ ছিল না। অথচ মুজিবনগরের নিরাপত্তার জন্য ১০০ গজ দূরত্বের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে থানা-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, আনসার ব্যারাক ও উপজেলা প্রশাসন। যেখানে ঢুকতে এবং রাত কাটাতে কঠোর নিরাপত্তা এবং অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। তাই সেখানে ঢুকে কিছু মানুষের এমন ধ্বংসযজ্ঞ মেনে নিতে পারছেন না তারা। আর এক মাসে এটি নিয়ে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তারা আরও হতাশ।

চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদার কলেজছাত্রী সুমাইয়া শারমিন বলেন, ‘এই ধ্বংসস্তূপ দেখে খুবই খারাপ লাগছে। কান্না পাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি বলে। কিন্তু এখানে পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংক্ষেপে একনজরেই জানা যেত। সেই মুজিবনগরের এই অবস্থা দেখে বাকরুদ্ধ আমি।’

গণপূর্ত বিভাগের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, এরশাদ সরকারের আমলে প্রথম নকশা অনুযায়ী মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হয়। পরে বিএনপি-আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে নকশা কাটছাঁট করে ২০১২ সালে এর কাজ শেষ হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে ২০২২ সালে সরকার মুজিবনগরের সব ভাস্কর্য ভেঙে আরও বড় এবং আন্তর্জাতিক মানের করতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। তবে সে কাজ আর শুরু হয়নি। তার আগেই বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়ল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগারটি।

মুজিবনগরের এই ভগ্ন রূপ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘মুজিবনগর কমপ্লেক্স একটা স্পর্শকাতর স্থান। এটা দেখভালের দায়িত্ব আমার না। তাই এ বিষয়ে কিছু বলার বা করার ক্ষমতাও নেই।’

মুজিবনগরে দায়িত্বরত ১৪ আনসার ব্যাটালিয়নের সুবেদার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আনসার সদস্যদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে কিছু দুষ্কৃতকারী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। সে ভিডিও অনেকের কাছেই আছে, যা দেখে দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।’

মেহেরপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার আবদুর মালেক বলেন, অতি-উৎসাহী লোকগুলো সেদিন মুজিবনগর গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি স্থাপনা ভাঙচুর করেছে। অথচ পাকিস্তান সেনাদের যে ম্যুরালগুলো আছে, সেগুলো ভাঙেনি। মুজিবনগর কমপ্লেক্স স্বাধীনতার ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। এটা দেশের সম্পদ। এটা জাতির চেতনার ওপর আঘাত করা হয়েছে।

মুজিবনগর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন পরিস্থিতির কারণে পুলিশ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। আর এখনো সেই ঘটনায় কোনো মামলা না হওয়ায় হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকরাম হোসেন রাজ মুজিবনগরের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সমন্বয়কের মুজিবনগরের ওপর এই আঘাতকে খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে দেখছি। আমরা ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। মুজিবনগরের আনসার ব্যাটালিয়নকে বলেছি, হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে।’ তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাব। মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল। এটাকে আবারও জীবন্ত করে তুলে ধরতে আমরা এই সরকারের কাছে দাবি জানাব। আমরা এমন ধ্বংসযজ্ঞের কোনোভাবেই সমর্থন করি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত