বরাবরই খুব বেছে বেছে কাজ করতে ভালোবাসেন নাজিয়া হক অর্ষা। আপনমনে শুধু নিজের কাজটাই করে যান, কারও সঙ্গে তুলনা কিংবা প্রতিযোগিতায় কখনোই নেই তিনি। মাঝে ওটিটিতে বেশ সরব দেখা গেছে এই লাক্স তারকাকে। পাশাপাশি নাটকেও। তিন মাস ধরে কোনো কাজেই অংশ নেননি। কাজ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইমরুল নূর
কাজের আপডেট কী
জুলাইয়ের আগে কিছু কাজ করা হয়েছিল কিন্তু সেগুলো এখনো অন এয়ার হয়নি। আগের পুরনো কাজগুলো অন এয়ার করার প্রচেষ্টা চলছে। তারপর পর্যায়ক্রমে নতুন কাজ শুরু হবে। ওটিটিগুলো থিতু হতে সময় নিচ্ছে। এখনো সার্বিক অবস্থায় দর্শক ওটিটির কাজ দেখবে কি না, তা একটা বিষয়। তবে আশা করছি নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভালো কিছু হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে যেকোনো ইস্যুতেই সংস্কার চেয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে। কাজের চেয়ে প্রতিবাদ বেশি হচ্ছে বলে মনে হয় কি?
লগ্নিকারকরা সরকারদলীয় ছিল। তারা এখন বিনিয়োগ করছেন না। টেলিভিশন নাটক, ইউটিউব ভিত্তিক নাটক, ওটিটি ও সিনেমা সব মিলিয়ে প্রতি বছর বড় রকমের বিনিয়োগ হয় ইন্ডাস্ট্রিতে। এখন কেউ কাজ করতে পারছে না। কাজ করতে না পারার সঙ্গে আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আন্দোলন এক জিনিস আর সংস্কার আরেক জিনিস। কেউ আন্দোলন করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকছে না। এখন প্রতিটা জায়গায় সংস্কার হচ্ছে তার জন্য কাজ বন্ধ থাকতেই পারে। তবে আন্দোলন আর সংস্কার শব্দের ব্যবহারে ভুল আছে। ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক জায়গায় বিতর্ক আছে। তাদের সরিয়ে নতুন কাউকে যুক্ত করাতে সময় লাগবেই। সবকিছু মিলিয়ে সবাই দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। পরিচালক, লাইটম্যান থেকে শুরু করে সবাই কাজ করতে চায় কিন্তু প্রযোজক কোথায়? এই মুহূর্তে এটাই বড় প্রশ্ন।
অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সভায় গিয়ে দেখলাম সবার প্রচুর অভিযোগ। এরপর এখন ডিরেক্টর গিল্ড, প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশন তারাও সংস্কার করার পথে।
শিল্পীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে সংস্কার দাবি জানিয়েছিলেন। তার অগ্রগতি কতটুকু?
সংস্কার দাবিতে আমরা অন্তর্বর্তী একটা কমিটির প্রস্তাব করেছিলাম, কীভাবে সংস্কার হবে তার রূপরেখাও প্রদান করেছি। তবে সমস্যা হচ্ছে আমরা জাতি হিসেবে সভ্য না। তাই যত পরিকল্পনাই দেন যদি তা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা গ্রহণ না করে, তাহলে হাজার প্রস্তাব দিয়েও ফলপ্রসূ অগ্রগতি হবে না। সবকিছুর আগে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে পরিবর্তন হওয়া জরুরি। আমাদের সরকারের দায়িত্বে যেই আসুক, ফলাফল শূন্য। একজন মানুষ যদি অন্যায় করার পরেও তার বোধোদয় না হয়, তাহলে তাকে নিয়ে আপনি যত সুন্দর প্ল্যান করেন তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ইতিমধ্যে কমিটি চারজনের নাম প্রকাশ করেছে। কমিটির প্রধান কাজ হবে আমাদের কোন কোন জায়গাগুলোয় দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন সেগুলো মন্ত্রণালয়ে আপিল করবে। গঠনতন্ত্রের কিছু পরিবর্তন এবং পরবর্তী নির্বাচনের আগে একটা রূপরেখা প্রণয়ন করবে।
অভিনয়শিল্পী সংঘের কমিটির সদস্যদের পদত্যাগের দাবি ছিল, কিন্তু কেউ পদত্যাগ করেননি। তাদেরকে রেখেই অন্তর্বর্তী সংস্কার কমিটি গঠিত হলো। সেটাতে আপনাদের সম্মতি ছিল?
আমি এখনো সম্মতি দিইনি। আমরা চেয়েছিলাম যারা আলো আসবে গ্রুপের সঙ্গে বা সরকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তারা নিজেদের ভুল বুঝে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসবেন। কিন্তু এমন কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। তার বড় কারণ, এখানে অনেকে চান সংস্কার হোক আবার অনেকে তা চাইছেন না। একজনের পক্ষে তো সব পরিবর্তন করা সম্ভব না। তা ছাড়া সংস্কার বলতে কী বুঝাতে চেয়েছি অনেকে তা-ই বুঝছেন না। যারা বর্তমান কমিটিতে আছেন তারা সরে গেলেই নতুন কেউ এসে বসবে। সংস্কার বলতে তারা এটাই বুঝে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ১ হাজার ৩০০ সদস্য (অভিনয়শিল্পী) আছে। আমি তো এত সদস্যকে কখনো দেখি না। কাজ তো করি আমরা ৫০। একটা কমিটি বাদ দিয়ে নতুন কমিটি এলেই সব সমাধান হয়ে যাবে না। একজন অভিনেতা তিনটা নাটকেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অভিনয় না করেও সদস্য হয়ে গেছেন। এমনকি অভিনয়শিল্পীর ড্রাইভারও সদস্য হয়ে গেছেন। কারণ এখানে নিয়ম-নীতি বলতে কিছুই নেই। আমরা চেয়েছি এমন মধ্যবর্তী কমিটি, যারা সঠিক নিয়মনীতি তৈরি করবেন। একজন শিল্পীকে কীভাবে সদস্য করা হবে, কীসের ভিত্তিতে হবে সব কিছুর পরিষ্কার বিধিমালা প্রণয়ন। যার ফলে পরবর্তী সময়ে যে সরকারই দায়িত্ব আসুক এই সংগঠনকে যেন দলীয়করণ না করতে পারে। ‘সাবা’ আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শন হচ্ছে। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে সেন্সর বোর্ড বাদ দিয়ে সার্টিফিকেশন সিস্টেম চালু হয়েছে। কিন্তু আমাদের নাটকে ইন্ডাস্ট্রিতে এত প্যাঁচ কেন?
সাম্প্রতিক ঘটনায় শিল্পীদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা চলে গেছে ...
শিল্পীদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত। একজন শিল্পী খারাপ কিছু করলে গোটা শিল্পীদেরকে গালি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা তো সিস্টেম হতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে শিল্পীসমাজ অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। ‘আলো আসবে’ গ্রুপের অভিনয়শিল্পীদের কারণে গোটা শিল্পীসমাজকে দর্শক ধিক্কার জানাচ্ছে। তারা ভাবতে শুরু করেছে অভিনয়শিল্পীরা এভাবেই সরকার থেকে সুবিধা গ্রহণ করে। কিন্তু অনেকেই তো ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। অনেকেই আছেন যারা কি না বিগত সরকারের কাছ থেকে কোনো বাড়তি সুবিধা নেননি। তবু কিছু মানুষের জন্য শিল্পীসমাজ ছোট হচ্ছে। তাদের অপরাধবোধ কাজে লাগিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা জরুরি ছিল। সিস্টেম পরিবর্তন করার জন্য সিনিয়ররা আমাদের পথপ্রদর্শক কিন্তু তারা যদি ঘাপটি মেরে বসে থাকেন, তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ তো হবেই। আমরা চুপ হয়ে আছি কারণ আমরা কোনো সিনিয়রদের অসম্মান করতে চাই না এবং করিও না।
সেই আস্থা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
বিশ্বাস তৈরি করতে অনেক সময় প্রয়োজন হয় কিন্তু বিশ্বাস নষ্ট হতে এক সেকেন্ডই যথেষ্ট। এই ঝামেলাটা শুরু হয়েছে ২০২০ সাল থেকে, করোনাকালে। ওই সময় যখন মানুষ ঘরবন্দি হয়ে গেল তাদের হতাশাগুলো মিডিয়ার মানুষদের ওপরে এসে পড়েছে। এই বিষয়গুলোয় তথ্য মন্ত্রণালয় বা আইসিটি মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমি কোনো ভুল করলে তার জন্য দর্শক এত কড়া ভাষায় সমালোচনা করতে পারে না। প্রতিটা জায়গায় দুর্নীতি হচ্ছে, সেখানে কেউ কিছু বলে না। কিন্তু গালিটা শুধু শিল্পীদের বা মিডিয়ার মানুষদেরই কেন দেওয়া হচ্ছে। কোনো শিল্পীর কাজ যদি আপনার ভালো না লাগে বা কেউ ভুল করেও থাকে, তাহলে আপনি বলতে পারেন যে, এই কাজটা করা ঠিক হয়নি। কারও অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে গালি দিতে পারেন কিন্তু জাতি-গোষ্ঠীর নাম ধরে গালি দেওয়া তো শোভনীয় না। আর শিল্পীদের উচিত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। সাদাকে সাদা বলা এবং কালোকে কালো। তাহলেই শিল্পীদের প্রতি মানুষের আস্থা আর ভালোবাসা পুনরুজ্জীবিত হবে।
