আন্তঃবিবাদে বিপর্যস্ত কুষ্টিয়া বিএনপি

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০২ এএম

রাজনৈতিক অঙ্গনে দেড় যুগ ধরে বঞ্চিত ছিল বিএনপি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সক্রিয় হতে শুরু করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে সক্রিয় হতে না হতেই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াচ্ছেন তারা। গত দেড় মাসে কুষ্টিয়ায় দলটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্রসহ দলটির একাধিক নেতার ভাষ্যে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তার, দখল ও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্যই এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সূত্রপাত হচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, শৃঙ্খলা ভেঙে পড়াসহ নানাবিধ কারণ ও নতুন কমিটি গঠন করে দলকে গতিশীল করার লক্ষ্যে সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলাসহ ৬টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা ও ৬৪টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সব সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে রুহুল কবীর রিজভী স্বাক্ষরিত একটি পত্রের মাধ্যমে কুষ্টিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি কুতুব উদ্দিনকে আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী জাকির হোসেনকে সদস্য সচিব করে দুই সদস্যের জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিগগিরই বাকি সব দলীয় ইউনিটের কমিটিও ঘোষণা করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন ওইসব কমিটিতে পদপদবি দখলের একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা আগে থেকেই ছিল। কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় এখন সেই প্রতিযোগিতা তীব্ররূপ ধারণ করেছে। কারণ আগামীতে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে দলীয় পদপদবি কে কতটুকু দখলে নিতে পারবে তার ওপর।

পুলিশ জানায়, গত দেড় মাসে জেলায় বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছোট-বড় অন্তত দেড় ডজন সহিংস ঘটনায় জড়ান। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে গত ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম চেয়ারম্যান মোড় এলাকায় বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে হামলার ঘটনায় দুজন গুলিবিদ্ধসহ ছয়জন আহতের ঘটনা। ওই ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সাতজনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কুমারখালী থানা ওসি আকিবুল ইসলাম জানান, ওই মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর দৌলতপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বরে চাঁদাবাজির দখল নিতে উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে হামলা চালান। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চারজন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ওই ঘটনায়ও মামলা হয়েছে বলে জানান দৌলতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান। গত ৮ সেপ্টেম্বর মিরপুর উপজেলা বিএনপির দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা স্থানীয় বাজারে শোডাউন ও সমাবেশ কেন্দ্র করে হামলা-পাল্টা হামলায় জড়ান। ওই ঘটনায় অন্তত সাতজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া পদ্মার তীরবর্তী ঘাটের দখল নিতে ভেড়ামারা-মিরপুরের বিএনপির দুপক্ষের মধ্যে হামলার ঘটনায় চারজন আহত হন। ওই ঘটনায় বিএনপি নেতা মুস্তাফিজুর রহমান মুস্তাক বাদী হয়ে ১০ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে মিরপুর উপজেলার ঈগল চত্বরে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন সাধারণ সম্পাদক রহমত আলী। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, এক আওয়ামী লীগ নেতার দখলে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ ইউরিয়া সারের দখল কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত।

কুষ্টিয়া-২ আসনের বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, ‘আওয়ামী লীগের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে তোলা ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষার স্বার্থে রাতারাতি খোলস পাল্টে কূটকৌশলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এসব সংঘাত সৃষ্টি করছে, যাতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদ দিলেও কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তবে এসব অপশক্তির মূলোৎপাটন করে শিগগিরই দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে।’

জেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলার কিছু বিঘ্ন ঘটার সংবাদ শুনেছি, যা অপ্রত্যাশিত। তাদের আচরণ অসহিষ্ণু। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেউ কেউ হয়তো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করছি। আশা করছি এসব ঘটনার কারণ শনাক্ত করে শিগগিরই উত্তরণে পথ বের করতে পারব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত