‘কেজির’ ইলিশে আক্ষেপ, ছোটতেই সান্ত্বনা

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৩২ পিএম

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ইলিশ বিক্রেতা মো. ফারুক। এই মৌসুমের শুরু থেকেই তিনি ইলিশ বিক্রি করছেন। তার কাছে দেড় কেজি থেকে ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। বড় ইলিশ কারা কিনছেন? কোন সাইজের ইলিশ বেশি বিক্রি হচ্ছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বড় ইলিশের চাহিদা খুবই কম। কারণ এক কেজি ইলিশের দাম ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা। তাই দাম শোনার পরেই অধিকাংশ ক্রেতা চলে যাচ্ছেন। তবে ছোট ইলিশের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। তাই বড় ইলিশের থেকে ছোট ইলিশ বেশি বিক্রি হচ্ছে। আজ (সোমবার) সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বড় ইলিশ একটিও বিক্রি হয়নি।’

বড় ইলিশ কারা কিনছেন? গড়ে প্রতিদিন কয়টি বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের পেশা যাচাই করে মাছ বিক্রিতো সম্ভব না, তাই সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বড় ইলিশের ক্রেতারা একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি মাছ নিয়ে থাকেন। এতেই বোঝা যায় উচ্চবিত্ত পর্যায়ের ব্যক্তিরাই বড় ইলিশ কিনছেন। প্রতিদিন আমি গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় ইলিশ বিক্রি করি। তবে দিনভেদে কমবেশি হয়। যেমন আজ বড় ইলিশের চাহিদা খুবই কম। তবে ছোট ইলিশ চাহিদা বেশি।’

আজ সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ধানমন্ডি থেকে কারওয়ার বাজারে ইলিশ কিনতে আসেন মো. শুকুর আলী। গ্রাম থেকে পরিবাদের সদস্যরা ঢাকায় বেড়াতে এসেছেন। তাদের জন্যই ইলিশ কিনবেন। কিন্তু বাজারে এসে পড়েছেন বিপাকে। ইলিশের কয়েকটি দোকান ঘুরে বড় ইলিশ কেনার চেষ্টা করলেন দীর্ঘক্ষণ। কিন্তু বড় এক কেজি বা এক কেজি দুই’শ গ্রাম ইলিশের দাম ১৭৫০ টাকা। এর থেকে কোনোভাবেই দাম কমানো সম্ভব হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে তিনি ৪০০ গ্রামের ইলিশ ৮০০টাকা কেজিতে কিনেছেন।

এসময় মো. শুকুর আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজের দেশের ইলিশ মাছ ইচ্ছে থাকতেও কিনতে পারলাম না। দাম এত বেশি যা সাধ্যের বাইরে। আমরা মাছে-ভাতে বাঙ্গাীি কথাটি বইতেও মানানসই এখন, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র বাজারে। এখন বাজারে আসলে দেশীয় সবধরনের মাছ বাড়তি দামে কিনতে হয়। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই ইলিশ মাছ। বছর যাচ্ছে ততই মধ্যবিত্ত নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে মাছটি। কারণ যে দামে বাজারে মাছটি বিক্রি হচ্ছে তা একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। তাই তিনি ইলিশ রপ্তানি বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন। যাতে সবাই মাছটি খেতে পারেন।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর জনতা বাজার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি ওজনের ইলিশ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৭৫০ থেকে ১৮০০ টাকায়। আর দুই কেজির উপরে গেলেই তার দাম দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার টাকার উপরে। আর ৯০০ গ্রাম ওজনের মাছটি বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ টাকা, ৬০০ গ্রাম ওজনের মাছটি কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকা, আর ৪০০ গ্রামের মাছটি কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। এই দুই মাছের বাজারে ক্রেতাদের বড় ইলিশের থেকে ছোট ইলিশ কিনতে আগ্রহী দেখা গেছে। বড় ইলিশের দাম বাড়তি হওয়ায় আক্ষেপ নিয়ে ছোট ইলিশ কিনছেন মানুষ। তাই খুচরা মাছ বিক্রেতারা বড় ইলিশের থেকে ছোট ইলিশ মাছ বেশি রাখছেন।
মোহাম্মদপুর জনতা বাজারে মাছ কিনতে আসেন রাহেলা বেগম। সকাল সকাল তাজা মাছ কিনতে তিনি বাজারে এসেছেন। রুই মাছ কিনলেও আগ্রহের বশে ইলিশের দাম জানতে চেয়ে তিনি হতবাগ হয়েছেন। এক কেজি ইলিশের দাম ১৮০০ টাকা শুনে তিনি আক্ষেপ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মাছের দাম বছরান্তে যেভাবে বাড়ছে তাতে একসময় এরকম ছোট বাজারে মাছের দেখাও মিলবে না। অনেক মাছ বিক্রেতা মানুষ দেখে ইলিশ মাছের দামও বলতে চান না। এরকম ঘটনাও আমি দেখি। তাই এই মাছ সহজলভ্য হওয়া উচিত। এখন বড়লোকের মাছ ’ইলিশ’। আর আমাদের মতো মানুষরা খাবে রুই-পাঙ্গাস।’

এই মাছের বাজারে গত ২০ বছর ধরে ইলিশ মৌসুমে মাছ বিক্রি করেন মো. আব্দুস সালাম। তার কাছে ইলিশের বাড়তি দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিন যাত্রাবাড়ী থেকে ইলিশ মাছ পাইকারি দরে কিনি। বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মাছ বিক্রি করি। এবার নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা কম পড়তেছে। তাই দামও বেশি। দাম বেশি হওয়ায় বড় ইলিশের ক্রেতা কম। তবে ছোট ইলিশের চাহিদা বেশি। ক্রেতারা বড় ইলিশের দাম শুনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু আমাদের বাড়তি দামে কিনতে হয়, তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে স্বীকৃত ইলিশ। টানা পাঁচ বছর ধরে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করে আসছে বাংলাদেশ। যদিও ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রপ্তানি বন্ধ ছিল। প্রায় প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে পাঁচ হাজার টন ইলিশের চাহিদার কথা জানিয়ে থাকেন ভারতের ব্যবসায়ীরা। ভারতের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ভারতে ইলিশ পাঠান। এবার পূজায় শুরুর দিকে ভারতে ইলিশ পাঠানো হবে না বলে গণমাধ্যমকে বলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।

তিনি গত (১৩ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা দেখেছি আমাদের দেশের মানুষই ইলিশ খেতে পারেন না। কারণ, সব ভারতে পাঠানো হয়। যেগুলো থাকে সেগুলো অনেক দামে খেতে হয়। আমরাও দুর্গোৎসব পালন করি। আমাদের জনগণও এটি উপভোগ (খেতে) করবে। এবারের দুর্গোৎসবে বাংলাদেশের হিন্দুধর্মাবলম্বীসহ অন্যান্য নাগরিকরা যেন ইলিশ খেতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা হবে। ভারতের চেয়ে দেশের জনগণকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে।’

পরে অবশ্য ভারতের বিশেষ অনুরোধে সেই অবস্থা থেকে সরে এসে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন রপ্তানিকারকদের আবেদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত শর্তাবলি পালন সাপেক্ষে ৩ হাজার টন ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ইতোমধ্যে ইলিশ রপ্তানি শুরু হয়েছে। বন্দরটি দিয়ে গত কয়েকদিনে ১০১ মেট্রিক টন ইলিশ গেছে।

এদিকে এবছর আবহাওয়া জনিত কারণে জেলেদের জালে গত বছরের তুলনায় পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়ছে না বলে জানা গেছে। গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়েও কয়েক দফায় সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ কারণে বারবার তীরে ফিরতে হয়েছে তাদের। এজন্য গত বছরের তুলনায় ইলিশ মাছের দাম বেশি। এর বাইরেও ভারতে রপ্তানির অযুহাতে অনেক মাছ ব্যবসায়ী ইলিশের বাড়তি দাম রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত