ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস লিকুর সম্পদ : ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক একান্ত সহকারী সচিব (এপিএস) প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হাফিজুর রহমান লিকুর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তার নিজ জেলা গোপালগঞ্জে ৫০০ বিঘার বেশি জমি রয়েছে। এছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে শেখ হাসিনা সংসদ বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালে লিকু দেহরক্ষী ছিলেন । ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর লিকুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তাকে প্রধানমন্ত্রী সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি দায়িত্ব পালনকালে গাবতলি বাস টার্মিনাল ইজারা নেন। এছাড়া বিভিন্ন দপ্তরে বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে পদ পাইয়ে দিতে তদবির বাণিজ্যে নেমে পড়েন। এসব কাজের মাধ্যমে তিনি দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন। লিকু নিজ এলাকা গোপালগঞ্জে ৫০০ বিঘা জমি কিনেছেন। এ ছাড়া ঢাকার বসিলা মধু সিটিতে দেড় বিঘা জমিতে নির্মাণ করেছেন ১০তলা ভবন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে তার অনেক সম্পদ রয়েছে। গোপালগঞ্জে তার ভাই-বোন ও শ্যালকসহ আত্মীয়-স্বজনের নামে বাড়ি, গাড়ি, মাছের খামার ও ঘের নির্মাণ করেছেন। তার পরিবারের নামে রয়েছে ঢাকা থেকে দক্ষিণবঙ্গগামী ওয়েলকাম পরিবহনের মালিকানা।
শ্রমের এপিএস সাহাবুদ্দিন : শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের এপিএস ছিলেন তার ভাই ছোট মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি এপিএস হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার তার মেয়ে শামীমা সুলতানা হৃদয়কে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, হৃদয়ের স্বামী মেহেরাব পাটোয়ারীকে সহকারী পরিচালক এবং বোনের ছেলে এ এম ইয়াসিনকে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সহায়তায় গঠিত কেন্দ্রীয় তহবিলের সহকারী পরিচালক পদে চাকরি দেওয়া হয়। নিয়োগের পর তাদেরকে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। আর তারা পুরো মন্ত্রণালয় নিজেদের কবজায় নেন। পরে তারা সিন্ডিকেটে করে কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেন যাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর ও শ্রম অধিদপ্তরের নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলের টাকা লোপাট করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর এপিএস সাহাবুদ্দিন ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রের এপিএস মনির হোসেন: সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের এপিএস ছিলেন মনির হোসেন। আসাদুজ্জামান কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মনির হোসেন একটি চক্র ঘুষ হিসেবে বস্তায় বস্তায় টাকা দিতে। পুলিশ, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস থেকে এই টাকা আদায় করা হতো। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সকল প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে এপিএসের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। দুর্নীতি দমন কমিশনে মনির হোসেনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা হওয়ার পর গত ১৫ আগস্ট অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি।
বস্ত্রের এপিএস এমদাদের অবৈধ সম্পদ : এক যুগের বেশি সময় সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এমদাদুল হক। ওই সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। রাজধানীতে নামে-বেনামে গড়েছেন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। চলতি বছরের ২০ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাস অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বস্ত্র মন্ত্রীর এপিএস ছিলেন এমদাদুল হক। একজন এপিএস ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ হাজার ১০ টাকা বেতন পান। সেই হিসাবে এমদাদুল হক গত ১৩ বছরে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা বেতন পাওয়ার কথা। অথচ তার দক্ষিণ বনশ্রী জামে মসজিদ-৪ এর কাছে বিশাল ভবন, কে-ব্লকের ১৩/৩ নম্বর রোডের ৩০/বি-৩০/সিতে বাড়ি, বাসাবোতে একটি ১০তলা ভবনে আটটি ফ্ল্যাট, একই এলাকার ছয়তলা আরেকটি ভবনে রয়েছে দুটি ফ্ল্যাট। ৩৬ নম্বর উত্তর বাসাবোর বেস্ট লিভিং লিমিটেডে অ্যাপার্টমেন্ট, রিমঝিম আবাসনের ১৫ শতাংশ শেয়ার, রূপগঞ্জের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প থেকে নামে-বেনামে প্লট গ্রহণসহ আরও অনেক সম্পদ রয়েছে।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এপিএস মীর মোশাররফ : সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মোহাম্মদ নাসিমের এপিএস ছিলেন মীর মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রভাব খাটিয়ে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের পরিচালক (প্রশাসন) পদে হাতিয়ে নেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যন্ত্রপাতি ও এমএসআর সামগ্রী সরবরাহে সহায়তার মাধ্যমে অবৈধভাবে লাভবান হয়ে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি তাকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ায় সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ গ্রহণের চেষ্টা-তদবির করেন।
