মুমিনুলের সেঞ্চুরির পর ভারতের ‘টি-টোয়েন্টি’ ব্যাটিং

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:০১ এএম

গ্রিন পার্ক স্টেডিয়াম তো নয়, যেন লন্ডনের গ্লোব থিয়েটার! পৌনে তিন দিন বৃষ্টির পেটে চলে যাওয়ার পরও ভারত-বাংলাদেশ টেস্টের পঞ্চম দিনে অপেক্ষা করছে দারুণ রোমাঞ্চকর পরিণতি। চতুর্থ দিনে মুমিনুল হকের সেঞ্চুরি, ভারতের সাদা পোশাকে টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং; সম্ভাব্য বিদায়ী টেস্টে সাকিব আল হাসানের ৪ উইকেট... এক দিনের খেলায় অনেক কিছুই দেখা গেল কানপুরে।

চতুর্থ দিনের খেলার সঙ্গে মেলানো যায় উইলিয়াম শেকসপিয়ারের কোন নাটককে। যাতে রোমান্স আছে, শিভালারি আছে, ট্র্যাজেডি আছে, খানিকটা ভাঁড়ামো বা ‘কমেডি অব এররস’ও আছে! একপাশে একের পর এক উইকেট পড়ছে, তবু অবিচল থেকে যাচ্ছেন মুমিনুল হক। তুলে নিলেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৩তম সেঞ্চুরি। জন্মদিনের এক দিন পর, সেই প্রথম দিন বিকেলে ৪০ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়ার পর চতুর্থ দিনে যখন ব্যাট করতে এসেছেন, তখন পরিস্থিতি একদম পাল্টে গেছে। ভারত জয়ের জন্য মরিয়া, জাসপ্রিত বুমরা রীতিমতো তোপ দাগছেন হাত থেকে, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ভেলকিবাজিও চলছে। এতসব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মমিনুল ১০৭ রানে অপরাজিত। ঠিক যেন ট্র্যাজিক হিরো। ওদিকে বাকিরা সবাই আউট, দলের রান ২৩৩। মধ্যাহ্ন বিরতির খানিকবাদে বাংলাদেশ অলআউট হলো, ব্যাটিংয়ে নামল ভারত।

ব্যাটিং দেখলে মনে হবে টি-টোয়েন্টি, কিন্তু পোশাকের রঙ সাদা আর বলের রঙ লাল! তাতে কি, ভারত পরিকল্পনা করেই নেমেছে, এক সেশনেই পারলে বাংলাদেশের রান ছাড়িয়ে যাওয়ার। যশস্বী জয়সওয়াল হাসান মাহমুদের প্রথম দুটো বল দেখার পর টানা তিন বলে বাউন্ডারি। রোহিত শর্মা অত বেশি দেখেননি, খালেদ আহমেদের করা প্রথম দুটি বলেই টানা দুটি বিশাল ছয়। এতেই পরিষ্কার হয়ে যায় ভারতের পরিকল্পনা, যেটা দিনের খেলা শেষে এসে আরও খোলাসা করে বলেছেন বোলিং কোচ মর্নে মরকেল।

উইকেট নিয়মিতই পড়েছে, কিন্তু রান আটকানো যায়নি ভারতের। তিন ওভারে দলগত ৫০ রান, ১০.১ ওভারে ১০০ রান, ২৪.২ ওভারে ২০০ রান; সবই দ্রুততম দলীয় রানের মাইলফলকে পৌঁছাবার রেকর্ড। প্রথম ২০ বলের ভেতর দলীয় ৫০ রান পূরণ করে ফেলায় ভারতের দ্রুততম রেকর্ড এটি, সব সংস্করণ মিলিয়ে। এর আগে গত বছর এশিয়ান গেমসে প্রথম ২২ বলে ৫০ রানে পৌঁছেছিল ভারত, সেটা ছিল টি-টোয়েন্টি ম্যাচে। ভারতের নয়জন ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন, তাদের ভেতর তিনজন বাদে বাকি সবার ব্যাটিং স্ট্রাইকরেট ১০০-এর ওপর! রোহিত ১১ বলে ২৩, জয়সওয়াল ৫১ বলে ৭২, শুবমান গিল ৩৬ বলে ৩৯ রান আর বিরাট কোহলি ৩৫ বলে ৪৭ রান করেছেন। যদিও খালেদ হাস্যকরভাবে রানআউট মিস না করলে কোহলি আরও অনেক আগেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন। লোকেশ রাহুল ৪৩ বলে করেন ৬৮ রান, এমনকি আকাশদীপও নেমে সাকিবের বলে ২ ছক্কা মেরে করেছেন ১২ রান। কেউ উইকেটে থিতু হওয়া, সময় নেওয়া এসব বিলাসিতা দেখাননি, ব্যক্তিগত লক্ষ্য বা মাইলফলকের কাছে গিয়ে সামান্যতম স্বার্থপরতাও দেখাননি। মাত্র ৩৪.৪ ওভারে ৯ উইকেটে ২৮৫ রান তোলার পর ভারত ইনিংস ঘোষণা করে দেয় ৫২ রানের লিড নিয়ে। ওভারপ্রতি গড়ে রান তোলার হার ৮.২২, এই হারে টি-টোয়েন্টিতেও রান তোলাটা কঠিন বাংলাদেশের কাছে। মেহেদী হাসান মিরাজ দিন শেষে সাংবাদিকদের সেটাই বললেন, ‘তারা সবাই আইপিএল খেলে, তিন সংস্করণই খেলে। তাদের জন্য এ রূপান্তরটা সহজ, তারা একটা পরিকল্পনা করেই এসেছে।’

সাকিব আল হাসান চেন্নাইতে নিষ্প্রভ থাকার পর কানপুরে বল হাতে সফল। ১১ ওভারে ৭৮ রান দিয়ে নিয়েছেন ৪ উইকেট। সম্ভাব্য শেষ টেস্ট ম্যাচে প্রথম ইনিংসে বল হাতে অল্পের জন্য ৫ উইকেট প্রাপ্তি হলো না।

শেষ বিকেলের আলোয় দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ বেছে নেয় রক্ষণাত্মক কৌশল, ভারতের ঠিক উল্টো। বাংলাদেশের জন্য তো খেলাটা এখন উইকেটে সময় পার করার, মাটি কামড়ে থাকার। প্রথম ইনিংসে সংগ্রামী শূন্যের পর এবার জাকির হাসান আউট হয়েছেন ১০ রান করে, অশ্বিনের বলে লেগবিফোর উইকেট। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি জাকির, ভারত সফরে তার ব্যাট হাতে কর্মকা- আপাতত শেষ। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে তার দলে থাকাটা কঠিন হয়ে যাবে ক্রমাগত বাজে পারফরম্যান্সের কারণে। একপ্রান্তে ৪০ বলে ৭ রান করে টিকে আছেন সাদমান ইসলাম। নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নামা হাসান মাহমুদ কেন যে অশি^নের বলে ওভাবে উড়িয়ে মারতে চাইলেন, সেটা বোধগম্য নয়। হাসানের আউট, খালেদের রান আউট মিস, বাজে ফিল্ডিং... এসবই সোমবারের কমেডি অব এররস।

দুপুরের খাবারের আগে শতরান করা মুমিনুলকে ব্যাট হাতে ফের আসতে হলো শেষ বিকেলে। দ্বিতীয় ইনিংসে দুই বল খেলে এখনো রান করার অপেক্ষায়। ভারতে সবশেষ সফরে টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন মুমিনুল, যে সফরের সমাপ্তিটা তার হয়েছিল ইডেনের গোলাপি বলের ম্যাচে জোড়া শূন্য দিয়ে। এবারে অন্তত একটা শতক নিয়ে ফিরছেন মুমিনুল, দেশের সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ডটা তারই থাকছে।

ভারতের লিড ২৬ রানের, বাংলাদেশের হাতে আছে ৮ উইকেট। খেলা বাকি আছে ৯০ ওভার। তাতে ভারতের চাই জয়, বাংলাদেশের চাই ড্র। মেহেদী হাসান মিরাজ স্পষ্ট করে বলে গেছেন, আগে নিজেরা বাঁচি! ভারতকে ফের ব্যাট করিয়ে অলআউট করা, এই অলীক স্বপ্ন দেখছে না বাংলাদেশ। বরং যতদূর সম্ভব ব্যাট করে ম্যাচটাকে ড্রয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা সফরকারীদের তরফে। অন্যদিকে ভারতের পরিকল্পনা পরিষ্কার, চতুর্থ ইনিংসে লক্ষ্য যাই দাঁড়াক না কেন, তাড়া করবে রোহিত অ্যান্ড কোং। সেটা সাদা পোশাকে আর লাল বলে টি-টোয়েন্টি খেলে হলেও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত