নার্স-মিডওয়াইফদের আজ কর্মবিরতি শুরু

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১৩ এএম

দেশের সব সরকারি হাসপাতালে নার্স ও মিডওয়াইফরা আজ মঙ্গলবার থেকে আট ঘণ্টার কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন। প্রথমদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা এবং আগামীকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করবেন তারা।

কর্মবিরতি চলাকালে সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোগীদের কোনো সেবা দেবেন না এবং প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত কোনো কাজ করবেন না তারা। তবে এ সময় জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীদের নার্স ও মিডওয়াইফ স্কোয়ার্ড সেবা দেবেন।

পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সব ধরনের সরকারি হাসপাতালে ৪৫ হাজার নার্স ও তিন হাজার মিডওয়াইফ কর্মরত আছেন।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে কর্মবিরতির সর্বশেষ ঘোষণা দেন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সংস্কার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. শরিফুল ইসলাম। এ সময় পরিষদের সদস্য সাব্বির মাহমুদ তিহানসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত রবিবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

কর্মসূচির বিষয়ে পরিষদের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত রবিবার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম পরিষদের নেতাদের ডেকেছিলেন। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু উপদেষ্টা দাবি পূরণের ব্যাপারে কোনো আশ্বাস দেননি। বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক হওয়ায় তিনি এড়িয়ে গেছেন এবং এ বিষয়ে সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেছেন। ফলে বাধ্য হয়ে পরিষদ কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কর্মসূচির ব্যাপারে পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর সংস্কার পরিষদ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক দফা দাবি পূরণের লক্ষ্যে সরকারকে তিন কর্মদিবসের সময় দেয়। কিন্তু সরকার এই সময়ের মধ্যে তাদের দাবির পক্ষে কোনো ধরনের ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় সংস্কার পরিষদ এই কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরিষদের এক দফা দাবি হলো নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল থেকে সব ক্যাডারকে প্রত্যাহার করে যোগ্য এবং অভিজ্ঞ নার্স পদায়ন করতে হবে। এই দাবিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

পরিষদ জানায়, কর্মবিরতির সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ইমারজেন্সি ওটি, ডায়ালাইসিস, আইসিইউ, সিসিইউ, পিআইসিইউ, এইচডিইউ ইউনিট কর্মবিরতির আওতামুক্ত থাকবে।

অধিদপ্তর ও কাউন্সিল প্রশাসন ক্যাডারের দখলে: নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নার্স ও মিডওয়াইফদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে মহাপরিচালক, পরিচালকসহ মোট পদের ৯১ শতাংশ পদেই নিয়োগ পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারসহ নার্সিং পেশার বাইরের লোকজন। এমনকি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান নার্সিং কাউন্সিলও দখলে প্রশাসন ক্যাডারের।

নার্সরা অভিযোগ করেছেন, নার্সদের পেশাগত দিক দেখভালের পরিবর্তে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নার্সদের পেশাগত সনদ দিচ্ছে। নিবন্ধন দিচ্ছে বেসরকারি নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটের। এসব অনুমোদনে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিদপ্তর হয় ২০১৬ সালে। এর আগে নার্সিং সেবা পরিদপ্তর ছিল। সেই পরিদপ্তরের ৪৮ বছরের ইতিহাসে প্রথম দুজন পরিচালক পূর্ণাঙ্গ পদে, অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেডে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এরপর সব পরিচালকই নিয়োগ পেয়েছেন দশম গ্রেডের সিনিয়র স্টাফ নার্স চলতি দায়িত্ব হিসেবে। এরপর ২০১৬ সালে সেবা পরিদপ্তর নার্সিং ও মিডওয়াইফার অধিদপ্তরে রূপান্তর হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এই অধিদপ্তরে মহাপরিচালক ও পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে কখনোই কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হয়েছে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের। 

এমনকি অর্গানোগ্রামে পদ না থাকলেও পরিচালক (শৃঙ্খলা) ও পরিচালক (অর্থ বাজেট) দুটি পদ তৈরি করে প্রশাসন ক্যাডারের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ক্যাডারের এসব লোকজন তাদের কাজের সুবিধার জন্য হাসপাতাল থেকে ৫০ জনের বেশি নার্সকে সংযুক্তিতে নিজ বেতনে এনে রেখেছে অধিদপ্তরে।

এ ছাড়া নার্সিং কাউন্সিলেও প্রধান পদ রেজিস্ট্রার একজন প্রশাসন ক্যাডারের লোক। বাকি দুটি পদ ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও সিনিয়র রেজিস্ট্রার পদে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে।

নার্সরা জানিয়েছেন, এসব প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সবসময় নার্স ও মিডওয়াইফদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর একজন বদলি প্রার্থী অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাকসুরা নূরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি নার্সদের পেশা এবং তাদের চাকরি সম্পর্কে কটূক্তি করেন। নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়া ভুল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মাকসুরা নূরের এই মন্তব্যে দেশের নার্স ও মিডওয়াইফরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে সর্বস্তরের নার্স ও মিডওয়াইফদের প্রতিনিধিত্বে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয়। ওই পরিষদ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল থেকে প্রশাসন ক্যাডারদের প্রত্যাহার করে নার্স ও মিডওয়াইফদের পদায়নের লক্ষ্যে এক দফা দাবি আদায়ে ৯ সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন শুরু করে।

ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরাতে শুরু করেছে: নার্সদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাকসুরা নূরকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও নার্সিং বিভাগ বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) নতুন রেজিস্ট্রার পদে ঢাকা নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত) হালিমা আক্তারকে নিয়োগ দেয়। এর আগে গত ১৯ আগস্ট আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাসির উদ্দিন। প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা কাউন্সিলের পরিচালক (প্রশাসন) পদের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রেজিস্ট্রার পদে ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত