পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ছয় সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের পর দেওয়া যাবে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ ও সমসাময়িক ইস্যুতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং তাদের তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে তারা ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির শুরুতে তাদের সুপারিশগুলো দেবে। আরও কিছু স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন আছে। তখনই কিন্তু রোডম্যাপ ঠিক করা যাবে। তার আগে রোডম্যাপ ঠিক করা যাবে না।’
সাধারণ পরিষদের সাইড লাইনের বৈঠকগুলোয় নির্বাচন নিয়ে বিদেশিরা কিছু জানতে চেয়েছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘সবার সঙ্গে আমরা বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করেছি যে, তাদের বেশি কিছু বলার ছিল না। আমরা তাদের প্রেক্ষাপট বলেছি। এ সরকার আসতে চায়নি এবং নিজে থেকে আসেনি।’
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যুব সম্প্রদায় কিছু জিনিস চায় এবং তারা এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে স্বৈরাচারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও তারা সংস্কার চায়। আমাদের এজেন্ডার সঙ্গে তাদের চাওয়া মেলে। আমরা গোটা বিষয়টি তাদের খুলে বলেছি এবং জানিয়েছি, এরপরে নির্বাচন দিয়ে আমরা এখান থেকে সরে যাব।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন বাংলাদেশি গ্রুপের কথা হয়েছে এবং সবাই জোর দিয়েছে যে আমরা যেন তাড়াহুড়ো না করি।’
যুক্তরাষ্ট্র সফর প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সবাই প্রফেসর ইউনূসের কাছে শুনতে চাইছিলেন যে, কী ঘটছে বাংলাদেশে এবং তার পরিকল্পনা কী। এটি আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে এর আগে বলেছি। কিন্তু তিনি সরাসরি হাজির হয়ে বলা এবং অন্য মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর মধ্যে পার্থক্য আছে।’ তিনি আরও বলেন,‘ আমরা জানি যে, হঠাৎ করে কিছু অর্জিত হয়ে যায় না। আমি এটুকু বলতে পারি যে, যারা দেখা করেছেন এবং যারা এককভাবে দেখা করেননি তারা সবাই বাংলাদেশের এই মুহূর্তে সার্বিকভাবে সহায়তার কথা বলেছেন এবং জানতে চেয়েছেন তারা কী করতে পারেন।
রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিহিত সীমান্তের ওপারে। সমাধান আমাদের এখানে নেই। আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। তারা যাতে মানবিক জীবনযাপন করতে পারে, সেজন্য তাদের সহায়তা করা হচ্ছে এবং আমরাও সহায়তা করছি। কিন্তু সমাধান মিয়ানমারে রয়েছে। তাদের ফিরে যেতে হবে এবং এর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ সৃষ্টি করতে হবে।’
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইড লাইনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কেননা আরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক আলোচনা আছে।’ তারা দ্রুত অন্যান্য ভিসা চালু করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
বিমসটেক সম্মেলনে মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে পারে ড. ইউনূসের : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, চলতি বছরের নভেম্বরে সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘নিউ ইয়র্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। কারণ আমাদের প্রধান উপদেষ্টা যেদিন নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছেন তার আগের দিন চলে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের সাক্ষাৎ কমনওয়েলথে হবে না (২১-২৬ অক্টোবর দ্বীপ রাষ্ট্র সামোয়ার রাজধানীর আপিয়ায় কমনওয়েলথ সম্মেলন)। কারণ ওখানে যাবেন না ভারতের প্রধানমন্ত্রী। উনি যাবেন ব্রিকসে। ব্রিকস তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আমাদের প্রধান উপদেষ্টাও যাবেন না (কমনওয়েলথ সম্মেলনে)।’
তৌহিদ হোসেন জানান, ‘আগামী মাসে (নভেম্বরে) হয়তো একটা সম্ভাবনা আছে। সে সময় বিসমটেকের সম্মেলনে হবে। এখনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। সেখানে হয়তো দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ হবে। এ ছাড়া আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে পারস্পরিক যে উদ্বেগ আছে সেটা সমাধানের চেষ্টা করব।’
পাকিস্তান ক্ষমা চাওয়ার সাহস দেখালে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসবে : পাকিস্তানের হাইকমিশনার সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন। এ নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ১৯৭১ সালের ঘটনায় পাকিস্তান ক্ষমা চাওয়ার সাহস দেখালে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও সহজ হয়ে আসবে। আবার এ কারণেই সম্পর্ক আটকে রাখারও কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘৫২ বছর যে বিষয় আছে, সেটা কাল সমাধান হবে বলে আমি মনে করি না। তবে যখন আমরা আলোচনার টেবিলে বসব, তখন ইস্যুটি থাকতে হবে।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি মনে করি পাকিস্তান যদি এ সাহসটুকু দেখায় যে, এখানে ১৯৭১ সালে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা উদ্ধৃত করে বলে আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী, এতে দোষের কিছু নেই। জাপান কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্য গত ৭০ বছর ধরে মাফ চেয়ে আসছে। পাকিস্তানও যদি এমন দেখাতে পারে তাহলে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও সহজ হয়ে আসবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট সচিব এম জসীম উদ্দিন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক হাসান।
