ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নার্স না পেয়ে দুর্ভোগ রোগীদের

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১৬ এএম

দেশে নার্স ও মিডওয়াইফদের তিন ঘণ্টার কর্মবিরতিতে সরকারি হাসপাতালগুলোয় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রোগীদের। সকালে রাউন্ডে এসে কোনো নার্স না থাকায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে বেশ বেগ পেতে হয় চিকিৎসকদের। কোনো কোনো চিকিৎসক নিজে উদ্যোগী হয়ে রোগীর ফাইল খুঁজে এনে প্রেসক্রিপশন লিখেছেন। কেউ মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের ডেকে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু রোগীর সার্বিক পরিস্থিতি জানা সম্ভব হয়নি অধিকাংশ চিকিৎসকের।

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রোগীদেরও বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ইনজেকশন দেওয়া, স্যালাইন দেওয়া ও খোলা, রক্তের নমুনা সংগ্রহ ও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীর সেবায় কোনো নার্স না পেয়ে রোগী ও রোগীর স্বজনদের খুব অসহায় দেখা গেছে। একজন নার্সের জন্য ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরতে দেখা গেছে স্বজনদের। এমনকি হাসপাতালের নিচে আন্দোলনরত নার্সদের কাছে গিয়ে রোগীর সেবার জন্য অনুনয় করতেও শোনা গেছে এক রোগীর স্বজনকে।

নার্স না পেয়ে অনেক হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের বাগ্বিতণ্ডা, এমনকি কর্র্তৃপক্ষের ওপর রোগীর স্বজনদের চড়াও হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। চিকিৎসার পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে বেশ বেগ পেতে হয়।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে, রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে রোগীদের এমন দুর্ভোগের কথা জানা গেছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশ জুড়ে সব সরকারি হাসপাতালে নার্স ও মিডওয়াইফদের তিন ঘণ্টার কর্মবিরতি ছিল। এ সময় রাজধানীসহ দেশের সব হাসপাতালেই কর্মবিরতি পালন করেন তারা। বিঘ্ন ঘটে চিকিৎসাসেবায়।

কর্মবিরতির ডাক দেওয়া নার্স ও মিডওয়াইফ সংস্কার পরিষদ কর্মবিরতি চলাকালে জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীদের জন্য বিশেষ স্কোয়াড থাকার কথা বললেও অনেক হাসপাতালে তা দেখা যায়নি। কোনো কোনো হাসপাতালে জরুরি সেবাও দিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন নার্সরা।

ঢামেক হাসপাতালে বেলা সাড়ে ১১টার সময় দেখা গেল প্রশাসনিক ভবনের নিচে আন্দোলনরত নার্সদের কাছে এক যুবককে ছুটে আসতে। ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডে ওই যুবকের ভাবি চিকিৎসাধীন। তার জরুরি রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। ওয়ার্ডে কোনো নার্স না থাকায় তিনি নিচে এসে নার্সদের কাছে সহায়তা চান। কিন্তু কোনো নার্স তার সঙ্গে যেতে রাজি হননি।

ওই যুবক জানান, তার ভাবি ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি। তিনি চট্টগ্রাম থেকে রক্ত দিতে এসেছেন। তবে কোনো নার্স না থাকায় রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে পারছেন না। এভাবে একবার নতুন ভবনের ব্লাড ব্যাংকে, আবার ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডে এভাবেই গত দেড়-দুই ঘণ্টা ঘুরছেন তিনি। কারও সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

২০৫ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দার শয্যার চিকিৎসাধীন এক মুমূর্ষু বৃদ্ধা রোগীর সঙ্গে থাকা এক স্বজন বলেন, ‘এখানে কোনো সুস্থ মানুষ এলেও মারা যাবে। এটা কোনো হাসপাতালের নার্সদের কর্মকাণ্ড হতে পারে না। সকালে এসেছি রোগী নিয়ে, তবে এখানে অক্সিজেন লাগানোরও কোনো লোক পাইনি। নিজেরাই অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েছি।’

একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আরেক রোগীর স্বজন বলেন, ‘এখানে মুমূর্ষু সব রোগী রেখে নার্সরা গেছেন তাদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে। কে মরল, কে বাঁচল, তা দেখার সময় তাদের নেই।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা গেছে। সকাল ৯টার দিকে তিনতলার শিশু ওয়ার্ডের সামনে চিকিৎসাধীন এক শিশুর বাবাকে পায়চারি করতে দেখা গেল। তিনি অভিযোগ করেন, তার শিশুর ইনজেকশন দিতে হবে। কিন্তু কোনো নার্স পাচ্ছেন না। পাশের দুটি ওয়ার্ডেও ঘুরে এসেছেন। সেখানেও কোনো নার্স পাননি। তিনি পরিচালকের কক্ষ থেকেও ঘুরে এসেছেন। সেখানেও কোনো সহযোগিতা পাননি।

একই ওয়ার্ডের আরেক শিশুর চাচাকে ইনজেকশন দেওয়ার জন্য নার্স খুঁজতে দেখা গেল। নিউমোনিয়া আক্রান্ত আট বছরের ভাতিজাকে দেখতে এসেছেন। কিন্তু এসেই দেখেন কোনো নার্স নেই। শিশুর সঙ্গে থাকা শিশুর মা নার্সের অভাবে শিশুকে স্যালাইন দিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে চাচা বের হয়েছেন নার্স খুঁজতে।

উত্তরা থেকে আসা চাচা আবদুল মালিক বলেন, সকাল থেকেই কোনো নার্স নেই। ডাক্তার এসে ফাইল খুঁজে না পেয়ে চলে গেছেন। বলে গেছেন পরে আসবেন। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সকাল ৯টায় স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার কথা। কিন্তু কোথাও একজন নার্স পেলেন না। কয়েকজনকে পেলেও তারা কর্মবিরতির পর আসবেন বলে জানিয়েছেন।

নিজের হাসপাতালসহ নার্সদের কর্মবিরতিতে চিকিৎসার নাজুক অবস্থা বলে জানান মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এসএম হাসিবুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নার্সদের কর্মবিরতিতে প্রচণ্ড সমস্যা হচ্ছে। রোগীরা তো বুঝতে চায় না যে আমাদের নার্স সংকট, চিকিৎসক আছে। এর মধ্যে নার্সরা কর্মবিরতিতে যাওয়ায় হাসপাতাল চালানো খুব সমস্যা হচ্ছে। ডাক্তাররা রোগীদের ইনজেকশন দিচ্ছেন। এসব নিয়ে মহাঝামেলা হয়েছে। রোগীরাও গোলমাল করেছে। পরে চিকিৎসকরা বেশি পরিশ্রম করে এবং নার্সদের কাজ করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। এখন যদি দ্রুত নার্সদের সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে আরও মুশকিল হবে। আগামীকাল (আজ বুধবার) পাঁচ ঘণ্টা, দুটা পর্যন্ত। এতে তো আমরা আরও বিপদে পড়ে যাব। উল্টো না এখন ডাক্তার সাহেবদের মার খেতে হয়। কারণ রোগীরা তো আর বুঝবে না যে নার্সদের জন্য চিকিৎসাসেবা বিঘœ হচ্ছে। আমরা খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে গেছি।’

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, এই হাসপাতালে এমনিতেই নার্স সংকট। থাকার কথা ৪১০ জন নার্স, আছেন ৩১০ জন। তার ওপর কর্মবিরতির কারণে নার্সরা কাজ না করায় তিন ঘণ্টা চিকিৎসা চালাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তাদের। রোগীরা অনেক দুর্ভোগে পড়েছে।

কর্মবিরতি স্থগিত : নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সংস্কার পরিষদের দাবি ছিল, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল থেকে সব ক্যাডারকে প্রত্যাহার করে যোগ্য এবং অভিজ্ঞ নার্স পদায়ন করতে হবে। এই দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার তিন ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন নার্স ও মিডওয়াইফরা। আজ বুধবার পাঁচ ঘণ্টা কর্মবিরতির কথা এবং দাবি না মানলে এরপর পুরো শাটডাউনে চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল পরিষদ।

এমন অবস্থায় গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের সঙ্গে বৈঠক করেন পরিষদ নেতারা। সেই বৈঠকে উপদেষ্টার দাবি পূরণের আশ্বাসে আজ বুধবারের কর্মবিরতি স্থগিত করেছে পরিষদ।

এ ব্যাপারে গতকাল রাতে পরিষদের অন্যতম সদস্য সাব্বির মাহমুদ তিহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা আংশিক দাবি মেনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘চারটি পরিচালক পদের মধ্যে আগামীকালের (আজ বুধবার) মধ্যে দুজন নার্সকে দায়িত্ব দেওয়ার আদেশ জারি করে দেবেন। বাকি পরিচালক ও মহাপরিচালকের পদ আপাতত শূন্য থাকবে। নার্সদের মহাপরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে চলমান নিয়োগ বিধিতে কিছু বাধা আছে। এই নিয়োগবিধি সংশোধন করে এটাকে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে নার্সরা মহাপরিচালক হতে পারেন। এমন নিয়োগবিধি প্রণয়নের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি করবেন। এজন্য আমরা আগামী দুদিন সময় নিলাম। কর্মবিরতি স্থগিত করা হলো। শুক্রবার পর্যন্ত সব কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। এর মধ্যে আশ্বাস পূরণ না হলে আবার শাটডাউনে যাব আমরা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত