হতদরিদ্র বাবা আব্দুল করিম অন্যের জমিতে কাজ করেন। স্বল্প আয় দিয়ে আট সদস্যের সংসার চালাতেই হিমশিম খান তিনি। তাই সুযোগ পেলেই বাবার সঙ্গে কাজে যেতেন কলেজপড়ুয়া দুই ভাই ইব্রাহিম ও হৃদয়। ইব্রাহিম দেখতে-শুনতে লম্বা। এ কারণে তার বাবার ইচ্ছা ছিল ইব্রাহিম পুলিশে চাকরি নিয়ে পরিবারের অভাব-অনটন দূর করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল পুলিশেরই গুলিতে।
গত ১৮ জুলাই মদন মগড়া নদীর সেতুর ওপর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছুড়ে পুলিশ। সেই গুলিতে গুরুতর আহত হয় ইব্রাহিম। তার শরীরে বিদ্ধ হয় ৩৫০টি ছররা গুলি। ৩৪৯টি গুলি তিনি সহ্য করতে পারলেও চোখে লাগা একটি গুলি সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে গুলিবিদ্ধ চোখে দুবার অস্ত্রোপচার করেছেন। কিন্তু গুলি বের করা যায়নি। সেই চোখেও কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চোখে লাগা গুলি মস্তিষ্কের কাছে পৌঁছে গেছে। সেটা বের করতে না পারলে বেঁচে থাকাটাই তার জন্য দুরূহ হয়ে পড়বে।
গুলিবিদ্ধ মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৭) নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের কদমশ্রী বড়হাটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের আব্দুল কারিমের ছেলে। তিনি মদন আদর্শ বাণিজ্যিক কারিগরি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, গত ১৮ জুলাই নেত্রকোনার মদন উপজেলার চাকরিপ্রত্যাশী ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ের মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হয়। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে পুলিশ। মদন উপজেলা শহরের মগড়া সেতুর ওপর পৌঁছানো মাত্রই গুলি চালানো হয় শিক্ষার্থীদের ওপর। ইব্রাহিমসহ গুলিবিদ্ধ হয় ১৯ জন। ইব্রাহিমের কোমরের ওপর থেকে মাথা পর্যন্ত ৩৫০টি গুলি লাগে।
ইব্রাহিমের স্বজনরা জানান, প্রথমে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পাঠান। চোখের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরে তাকে বাংলাদেশ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে প্রথম অস্ত্রোপচারের পর এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখে চিকিৎসকরা। এরপর বাড়িতে নিয়ে আসা হয় ইব্রাহিমকে। আত্মীয়-স্বজন চট্টগ্রামের থাকার কারণে দ্বিতীয় দফায় চট্টগ্রাম পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এমআরআই করার পর ধরা পড়ে গুলি মস্তিষ্কের কাছাকাছি। আবার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসা সহায়তার জন্য মদন উপজেলার ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সরকারিভাবে সহায়তা করতে পারেননি। তবে তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করে মদনের অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। এরপর তারা সেনা ক্যাম্পে যোগাযোগ করলে তাদের পরামর্শে ইব্রাহিমকে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিএমএইচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর চোখের মধ্যে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করা হয়। এখন পর্যবেক্ষণে আছেন তিনি। কারান্তরীণ বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে ঢাকা উত্তরের যুবদল নেতা শরীফুল আলম মাসুম তার নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন।
ইব্রাহিমের বড় ভাই হৃদয় বলেন, ‘বাবার ইচ্ছা ছিল ইব্রাহিম পুলিশে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অধিকার আদায় করতে গিয়ে চোখ হারিয়েছে ইব্রাহিম। তার চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ধারদেনা করে চার লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। এখন ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে ইব্রাহিমের চিকিৎসা চলছে। গুলি মস্তিষ্কের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় তা বের করতে হলে বিদেশে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এখন তার চিকিৎসা কীভাবে করব তা বুঝে পারছি না।’
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ব্যক্তিগত সহকারী মির্জা হায়দার আলী জানান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে ইব্রাহিমের দেখভাল করছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের যুবদল নেতা শরিফুল আলম মাসুম। তাকে সুস্থ করার জন্য সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।
