ছয় মাসের ব্যবধানে চার দফা কার্গো বিমানের ভাড়া বাড়িয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ঢাকা-টরন্টো, ঢাকা-ম্যানচেস্টার, ঢাকা-জেদ্দা রুটে কার্গো ভাড়া প্রতি কেজিতে দেড় ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪ ডলার করা হয়েছে। একই সঙ্গে জায়গা বেশি নেওয়ার অজুহাতে শাক-সবজির জন্য কার্গো স্পেসও কমিয়ে দিয়েছে বিমান। বেশি টাকা দিয়েও অনেকে সবজি দেশের বাইরে পাঠাতেও পারছেন না বলে জানা গেছে। এই নিয়ে যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজার হারানোর শঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় রপ্তানিকারকরাও আছেন উদ্বেগের মধ্যে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে বার্ষিক চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করে থাকেন রপ্তানিকারকরা, যা এক বছর বলবৎ থাকে। এক্ষেত্রে বছরে অন্য সময়ে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি করা হলে বিদেশি ক্রেতা অতিরিক্ত ভাড়ায় পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হন না। এতে এই খাতে রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিমানের উচিত তাড়াতাড়ি ভাড়া কমিয়ে নিয়ে আসা।
প্রায় ১৫ বছর ধরে ইউরোপে সবজি রপ্তানি করেন জুলহাস কবির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানে শুধু ভাড়া বৃদ্ধি হচ্ছে। আগের চেয়ে সবজি পাঠানো কমিয়ে আনা হয়েছে। সবজি না পেয়ে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ অন্য দেশ থেকে ক্রেতারা সবজি ক্রয় করছেন। তবে তারা এখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশের সবজি নাকি তাদের ভালো লাগে না। তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপ-এশিয়ার মতো বড় বাজার আমাদের হাতছাড়া হবে বলে মনে হচ্ছে। ভাড়ার বিষয়টি সরকারের উচিত দ্রুত সমাধান করা। আর না হয় আমাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশে ফল-সবজি পাঠাতে বিশাল অঙ্কের অর্থ গুনতে হচ্ছে। বিমানের স্থানও কমিয়ে আনা হয়েছে। বিমান ভাড়া আগের মতো নিয়ে আনতে পারলে আমাদের জন্য খুবই উপকার হবে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের পণ্য পাঠাতে হলে তাদের অনুমোদিত নিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। দেখি সামনের দিনগুলোতে কী হয়।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, অতিরিক্ত খরচ ও বিমানে জায়গার অভাবে চাহিদামতো রপ্তানি করতে না পারলে বাংলাদেশি শাক-সবজি ও ফলে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছে কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যান্ড এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফভিএপিইএ)। এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলেও তা কৃষি মন্ত্রণালয় হয়ে বিমান মন্ত্রণালয় থেকে বেসামরিক বিমান চলাচাল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে যেতে প্রায় তিন মাস সময় লেগে যায়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিএফভিএপিইএর পক্ষ থেকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। ২৫ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয় ওই চিঠিটি সংযুক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিমান মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠায়। পরে রপ্তানিকারক সংগঠন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের চিঠিটি সংযুক্ত করে গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানকে আরেকটি চিঠি পাঠায় বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বিমানবন্দরের কার্গো লোডিং এরিয়া সম্প্রসারণ ও পর্যাপ্ত জায়গায় কার্গো লোডিংয়ের বিষয়ে মতামত প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিএফভিএপিইএর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর স¦াক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো লন্ডন, ম্যানচেস্টার, টরন্টো, সৌদি আরব, ইউএই, ওমান, কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে রপ্তানি করে আসছে। আকাশপথে রপ্তানি করে বিমানের আয় বৃদ্ধিসহ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। কিন্তু বিমানের কার্গো কর্তৃপক্ষ ঢাকা-লন্ডন এবং ঢাকা-ম্যানচেস্টার এবং ঢাকা-জেদ্দা রুটে মাত্র তিন সপ্তাহে ৪ দফায় কেজিপ্রতি পণ্যে শূন্য দশমিক ৭০ ডলার (৭৭ টাকা), ঢাকা-টরন্টো রুটে মাত্র এক সপ্তাহে ৩ দফায় প্রতি কেজি পণ্যে শূন্য দশমিক ৩০ ডলার (৩৩ টাকা) এবং ঢাকা-জেদ্দা রুটে শূন্য দশমিক ১০ ডলার (১১ টাকা) পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি করেছে।
কার্গো স্পেসের বিষয়ে রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, আরএমজি ও অন্যান্য ড্রাই কার্গোর তুলনায় কৃষিপণ্যের কনটেইনারের ধারণক্ষমতা বেশি হওয়ার কারণে বিমান বেশি লাভবান হওয়া সত্ত্বেও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের চাহিদামতো স্পেস বরাদ্দ দিচ্ছে না। তারা আরএমজিসহ ড্রাই কার্গো প্রেরণ করে থাকে। আবার কৃষিপণ্য পচনশীল পণ্য হওয়ায় আকাশপথ ছাড়া দ্রুত রপ্তানির বিকল্প নেই। ড্রাই কার্গো আকাশপথ ছাড়াও সমুদ্রপথে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশের এয়ারলাইনস শাক-সবজি ও ফলমূলের মতো পচনশীল পণ্য পরিবহন ভাড়া এত অল্প সময়ে এত হারে বৃদ্ধির কোনো নজির নেই। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অন্য দেশগুলোতেও বেড়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে যে হারে বাড়ানো হয়েছে তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের আগে যেখানে দেড় ডলার খরচ ছিল, সেটা এখন বেড়েছে ৪ ডলার। অতিরিক্ত এই খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কার্গো বুকিংও কমে গেছে। এর প্রভাবে এসব পণ্য রপ্তানি দুই-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ও ক্রেতা হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমাদের বড় প্রতিযোগী দেশ হচ্ছে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা। এই সুযোগে বিদেশি ক্রেতারা আমাদের ছেড়ে এসব দেশে চলে যাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশের সঙ্গে আকাশপথে সরাসরি কার্গো পরিবহনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাজ্য। দেশটির পরামর্শে নিরাপত্তা পরামর্শক নিয়োগ করে বিমানবন্দরের কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং যন্ত্রপাতি স্থাপন করে। দেনদরদার করে ২০১৮ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে সরাসরি আকাশপথে পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে দেশটি। তিনি বলেন, ভাড়ার অজুহাতে সবজি বাজার নষ্ট হয়ে গেলে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই নেই।
বিমান বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডলারের দাম বেড়ে গেছে। পাশাপাশি বিমানের ফুয়েলের দামও আকাশচুম্বী। ফলে বিমান ভাড়া বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। স্পেস নিয়ে যে জটিলতার বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা চলছে। তবে এটা ঠিক ভাড়া বেশি হয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ বা এশিয়ার বাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা আছে তা কিন্তু সঠিক। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমার জানামতে, সবজি ও ফল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সবজি ও ফল রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর ৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের সবজি ও ১ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের ফল রপ্তানি হয়। আমরা চেষ্টা করছি ভাড়ার বিষয়টি আরও কমিয়ে আনতে।
