গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে চলতি বছর আগস্ট মাসের ৫ তারিখ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পতন হয় সাড়ে ১৫ বছর একটানা শাসন করা আওয়ামী লীগ সরকারের। এই শাসনামলে গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হয়, একের পর এক পাতানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে কেড়ে নেওয়া হয় বাকস্বাধীনতা। শেষ দিকে গণহত্যার যন্ত্র হয়ে ওঠে পুলিশ বাহিনী। ফলে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিলেও, জনগণের কাছে আস্থা এবং আত্মবিশ^াস না থাকার ফলে অনেক স্থানে পুলিশ কাজে ফিরতে পারেনি। যে কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় দুই মাস হলেও এখনো এ বিষয়ে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা নিয়ে দেশের সচেতন সমাজ উদ্বিগ্ন। অবশ্য কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নয়, জনগণ আশা করছে রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ দেশে গণতন্ত্র ফেরাতে সামগ্রিক সংস্কারের। আশার ব্যাপার, সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এসব নিয়ে আরেক দফা আলোচনা করবেন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে।
আগামীকাল থেকে তৃতীয় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে উপদেষ্টারাও উপস্থিত থাকবেন। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ইতিমধ্যে দুই দফায় উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সভা হয়েছে। এরই চলমান প্রক্রিয়ায় শনিবার থেকে আবারও নতুন দফায় আলোচনা শুরু হবে। দেশের প্রধান দলগুলোর সঙ্গে এ আলোচনা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, সংবিধান ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠনের কথা জানান। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে সফর রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ইফতেখারুজ্জামান ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। এ ছাড়া সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে প্রথমে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিকের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা পরিবর্তন করে অধ্যাপক আলী রীয়াজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে কমিশনের কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু কমিশন গঠনের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করতে পারছে না। প্রেস সচিব জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে আলোচনার মুখ্য বিষয় হবে ছয় সংস্কার কমিশনের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবহিত করা। এ ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা হবে এবং তাদের পরামর্শ নেওয়া হবে। তিনি অবশ্য নিশ্চিত করেছেন যে, কমিশন গঠন রাজনৈতিক দলের আলোচনার ওপর নির্ভর করছে না। তিনি জানান, কমিশনগুলোর প্রধানরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। কার্যপরিধিও ঠিক করা হয়েছে। তাদের জন্য অফিস খোঁজা হচ্ছে। যারা সদস্য হবেন এখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রক্রিয়ার অগ্রগতি হচ্ছে। উল্লেখ্য, শপথ গ্রহণের আগে-পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দুই দফা আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ কেউ নির্বাচনী রোডম্যাপ জানতে চাইলেও সরকার থেকে তা পরিষ্কার করা হয়নি বা এই সরকার কত দিন ক্ষমতায় থাকবে তা নিয়েও সুস্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের জন্য এই সরকারকে সময় দিতে ধৈর্যধারণ করবে বলেই আশ্বাস দিয়েছে।
এই মুহূর্তে দেশের আইনশৃঙ্খলা অবস্থার উন্নতি এবং আকাক্সিক্ষত সংস্কারের জন্য সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ভীষণ জরুরি। আশা করা যায়, আসন্ন বৈঠক এ ব্যাপারে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভীষণ দরকার। উন্নয়ন চলমান রেখে গণতন্ত্রের স্বার্থেই সব রাজনৈতিক দলকে এক সুরে কথা বলার বিকল্প নেই। এটা যেন ভুলে না যাই।
