অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। চারদিকে চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক রূপের মাধুর্য। এই রূপের মাধুর্যে আরও বৈচিত্র্য এনেছে ছয় ঋতু। একেক ঋতুতে এ দেশ সাজে একেক রূপে। গ্রীষ্মে থাকে সূর্যের উত্তাপ। যদিও আমাদের রৌদ্রদগ্ধ হতে হয় না মরুর দেশের মতো। ওইটুকু উত্তাপকে মরুবাসীরা বলবে তেজোহীন সূর্য। বর্ষকালে চারদিকে থৈ থৈ পানি দারুণ উপভোগ্য। তবে কখনো কখনো বন্যার কবলেও পড়তে হয়। বর্ষার ক্রমাগত বর্ষণ শেষে শরতের আগমন। দীপ্তিমান নীল আকাশে ভেসে চলে শুভ্র মেঘ, সূর্যের নরম আলোয় নয়নাভিরাম সবুজ প্রকৃতি এবং রাশি রাশি শিউলি ফুল। এরপর নবান্ন উৎসবের হেমন্ত। মাঠে সোনালি ফসল, পাকা ধানের গন্ধে কৃষক-কৃষাণির বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর শীত-গরমের মাখামাখি, নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ। হেমন্তের সোনালি ডানায় ভর করে আসে শীত। ঠাণ্ডার প্রকোপে রোদের তাপ সেবন, বাহারি পিঠাপুলি, নতুন সবজি আর শর্ষের ক্ষেত যেন হলুদের সাগর-নদী। সবশেষে সুগন্ধি ও সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে আসে বসন্ত। চারদিকে ঝিরিঝিরি বাতাস, পত্রঝরা বৃক্ষে নবপল্লবের আশীর্বাদ আর সবুজের ঢেউ খেলানো প্রকৃতি। প্রকৃতি কত বৈচিত্র্যে কতভাবে স্নেহভরে প্রাণিত ও শানিত করে আমাদের। প্রকৃতির এমন স্নেহপূর্ণ আচরণ আর কয়টি দেশের নাগরিকের ভাগ্যে জোটে? ঋতুর ক্রমাগত পরিবর্তন বছরব্যাপী আমাদের চারপাশকে সাজায় ভিন্ন ভিন্ন আমেজে। প্রকৃতি কত সহজে, কত সারল্যে আমাদের জন্য এসব পরিবর্তনকে বহন করে নিয়ে চলে। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই।
প্রকৃতিতে নানা বৈচিত্র্য আছে, বৈরিতা নেই। প্রকৃতির বৈচিত্র্যের মতো আমাদের দেশের ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও সংস্কৃতিতেও নানা বৈচিত্র্য আছে, বৈরিতা নেই। সাধারণভাবে বলতে গেলে, আমাদের প্রকৃতির উপাদান-উপকরণে অতিমাত্রায় কিছু নেই, যা আছে সব সহনীয় মাত্রায়। প্রকৃতির এই স্বভাব পেয়েছে দেশের মানুষ। তাই তো এ অঞ্চলের মানুষ স্বভাবে সহজ-সরল, তবে সাধনা-পরিশ্রমে কঠোর। আর সহজ-সরল মানুষের হৃদয় থাকে স্বচ্ছ। আবেগ থাকে প্রবল। কেননা আবেগ স্বচ্ছ হৃদয়েই জায়গা নিতে পারে। স্বভাবে কঠোর ও উগ্রদের হৃদয়ে আবেগ প্রবেশ করতে পারে না। স্বভাবে সহজ, সরল, আবেগী এবং সাধনা-পরিশ্রমে নিবেদিতপ্রাণ জনগোষ্ঠীর জাতীয় নেতৃত্বে যদি নীতিবান মানুষরা থাকেন তাহলে তাদের উন্নতি-অগ্রগতি হাতের নাগালে থাকে। শুধু অঞ্জলি ভরে উঠালেই হয়।
একটি ধ্রুব সত্য হলো, প্রকৃতিও বৈরী আচরণ করে। যখন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং চারদিক জর্জরিত হয় নানা ধরনের দূষণে, তখন প্রকৃতিতে বিরাজ করে কোলাহল। প্রকৃতির উপাদন-উপকরণে লেগে যায় বিশৃঙ্খলা। প্রকৃতি হয়ে ওঠে হুজুগে। ফলে সময়ে-অসময়ে রোদে পোড়ায়, বন্যায় ভাসায়। এতে মানুষের ভেতরে দানা বাঁধে অস্থিরতা। প্রকৃতির স্বভাবই মানুষ নিজের ভেতর ধারণ করে চেতনে-অবচেতনে। তাই তো স্বভাবে সহজ-সরল মানুষের ভেতরে লালিত হয় হুজুগেপনা ও অস্থিরতার সুপ্ত স্ফুলিঙ্গ। যদিও তা নিজে নিজে বিস্ফোরিত হওয়ার মতো অতটা তীব্র হয় না। বরং সহনীয় মাত্রাতেই থাকে। এ অঞ্চলের মানুষের ভেতরের অবস্থা যখন এমন, তখন স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী কয়েকটি মহল অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে মানুষকে বিভিন্নভাবে উসকে দেওয়ার কাজে লেগে থাকে। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু কার্ড খেলার প্রচলন এ অঞ্চলে অনেক পুরনো। বিভিন্ন ফায়দা হাসিল করতে সেই ব্রিটিশ থেকে শুরু করে শেষ পতিত স্বৈরাচার পর্যন্ত প্রায় সবাই এই খেলায় মেতেছে এবং মানুষের ভেতর সুপ্ত হুজেগেপনা ও অস্থিরতার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থাপনায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন তারা সবাই আস্থাভাজন। আমরা আশাবাদী, তারা প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজগুলো করবেন এবং এ কাজে দেশের মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে সহযোগিতা করবেন। কিন্তু গত দুই মাসে বিভিন্ন মহলে হুজুগেপনা ও অস্থিরতার যে বিস্ফোরণ দেখা গেল, তা খুবই দুঃখজনক। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে মানুষকে বিভিন্নভাবে উসকে দিয়েছে তারা খুব জঘন্য কাজ করেছে। এমন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়ে জঘন্য বলা হয়েছে ইসলামে। মানুষের ভেতরের সুপ্ত হুজুগেপনাকে উসকে দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করা কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তাতে অশান্তি বিস্তার করো না।’ (সুরা আরাফ ৫৬)
সম্প্রতি স্কুলের পাঠ্যপুস্তক সংস্কার ও পরিমার্জনের জন্য গঠিত কমিটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ কমিটি গঠন হওয়ার আগে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিকদের পক্ষ থেকে কমিটিতে একজন ইসলামি স্কলার রাখার দাবি উত্থাপিত হয়। পরে দেখা যায়, কমিটিতে ইসলামি স্কলার হিসেবে দুজন রাখা হয়েছে। দুজনের একজন হলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি ইসলামই পুরোপুরি মানেন না এবং নিজে নিজে বাংলা পড়ে ইসলামি স্কলার সেজেছেন। অবশ্য পরবর্তী সময় সমালোচনার তোপে পড়ে তাকে এ কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যে বা যারা তাকে এই কমিটিতে রেখেছেন, তাদের কি উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে পাঠ্যপুস্তকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা? নাকি পতিত স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে সুপ্ত হুজুগেপনার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা? এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। এই ৯০ শতাংশের প্রায় পুরোটাই ধর্মপরায়ণ ও ধর্মভীরু। এর বাইরে যারা নিজেদের ভেতর পশ্চিমা কালচার লালন করেন তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। তারা ১ শতাংশ মুসলিম জনগণের প্রতিনিধিত্বও করেন না। তাহলে জাতীয় পর্যায়ের কোনো কাজে তাদের মতো বিতর্কিতদের রাখা হয় কেন? এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকদের মতামত হলো, ‘সুপ্ত হুজুগেপনাকে উসকে দিতেই তাদের এসব কমিটিতে রাখা হয়।’ হুজুগেপনা ও অস্থিরতা এ অঞ্চলের মানুষের স্বভাবে সুপ্ত আছে। যারা বিশেষ স্বার্থ হাসিলের জন্য একের পর এক বিতর্কিত ইস্যু সামনে এনে মানুষের হুজুগেপনাকে উসকে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন তাদের উদ্দেশে কথা হলো, আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। চোখ বুজে একটু চিন্তা করে দেখুন, হাশরের ময়দানে আপনার অবস্থান কেমন হবে? উত্তর পেয়ে যাবেন। যদি উত্তর না পান, তবে মৃত্যুর পর অবশ্যই পাবেন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
