এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আমরা চার্বাক নামে একটা নাটকের দল করি। সেই নাটকের রিহার্সেল হতো নিউ ইস্কাটন চার্চ পরিষদে। সেখানেই অমিত হাবিবের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয় আমার বন্ধু যিশু তরফদার।
পরিচয়ের শুরুতেই আমরা বন্ধু হয়ে যাই। দারুণ প্রগতিশীল তরুণ অমিত। তার বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তায় আমি মুগ্ধ হই। তুখোড় আড্ডা হয় আমাদের ইস্কাটন কফি হাউজে। সেই আড্ডায় তখনকার বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কবি, অভিনেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা পালা করে আসতেন। সাপ্তাহিক বিচিন্তা সম্পাদক মিনার মাহমুদ প্রায় সন্ধ্যায় যোগ দিতেন আমাদের সেই আড্ডায়।
একদিন অমিত হাবিব আমাকে জানান, আককাস আমি বিচিন্তায় লেখতে চাই। আমি অমিতের লেখালেখি সম্বন্ধে তখনো জানি না কিছুই। আমিও তখন বিচিন্তা পরিবারের একজন।
অমিতকে বললাম, আগামীকাল আসেন বিচিন্তা অফিসে, মিনার ভাইকে বলি।
পরদিন মিনার ভাইকে অমিতের আগ্রহের কথা জানালাম। মিনার ভাই খুব একটা পাত্তা দিলেন বলে মনে হলো না (মিনার মাহমুদ এমনই)!
মিনার ভাইকে আমি কিছুটা চেপে ধরে বললাম, আপনি অমিতকে যেকোনো একটা অ্যাসাইনমেন্ট দেন, পছন্দ হলেই তো ছাপবেন। মিনার মাহমুদ বেশ ভাব নিয়ে (যেন অমিতকে দিয়ে হবে না) বললেন, তাকে বলেন সাত দিন টেলিভিশন (তখন শুধুই বিটিভি) মনোযোগ দিয়ে দেখে ‘টেলিভিশন সমালোচনা’ লিখতে!
মিনার ভাইয়ের রুমের বাইরে এসে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এ কথা অমিতকে কীভাবে বলি বা অমিত কী ভাববেন। মনে মনে মিনার ভাইয়ের ওপর রাগ করলাম, কোথায় একটা ভালো অ্যাসাইনমেন্ট দেবে, তা না করে কী একটা টেলিভিশন সমালোচনা লিখতে বললেন।
আমি অমিতকে বললাম। অমিত সাদরে গ্রহণ করলেন। সাত দিন পর অমিত এলেন হাতে অনেকগুলো নিউজপ্রিন্টের কাগজ নিয়ে। মিনার ভাই পড়লেন। পড়া শেষ করে বললেন, অমিত আপনি দারুণ লেখেন। চমৎকার আপনার গদ্য...।
তারপর অমিতকে আর কেউ আটকাতে পারেনি।
অমিত শুধুই অমিতের প্রতিদ্বন্দ্বী।
অমিতের ব্যস্ততা বাড়ল, আমাদেরও যোগাযোগটা কমল, কিন্তু হৃদয়ের টানটা আরও বাড়ল। অমিতের সাফল্যে গর্ব হচ্ছিল। দেখা কম হতো কিন্তু বন্ধুত্বটা ছিল আগের মতোই।
দেশ রূপান্তরের সম্পাদক হয়ে অমিত বাংলা মোটরে অফিস শুরু করলেন। আমি নিউ ইস্কাটনে। ৫ মিনিটের দূরত্ব।
একদিন ফোন করে অমিত বললেন, এখন তো আমরা খুব কাছাকাছি, একবেলা আসেন, চা খাই।
ফিরে যাই আমাদের নাটকের রিহার্সেলের সময়ে, আশির দশকের শেষের দিকে। রিহার্সেল শেষে তখন আমাদের নিয়মিত আড্ডা ইস্কাটনের কফি হাউজে। মান্না দের গানের মতোই সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, ইস্কাটনের কফি হাউজও নেই!
বুকভরা কষ্ট নিয়ে বলতে হচ্ছে আজ আমার বন্ধু অমিত হাবিবও নেই। অমিত এখন অন্য ভুবনে।
আজ অমিতের জন্মদিন
আনন্দে থেকো বন্ধু...
অনন্ত শান্তিতে...
লেখক : আলোকচিত্রী
