চবি খুলছে কাল

অর্ধযুগ পর বৈধভাবে হলে ফিরছেন শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১৫ এএম

অর্ধযুগেরও বেশি সময় পর বৈধভাবে আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ পেতে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে আসন বরাদ্দ পাওয়া শিক্ষার্থীদের দেওয়া লাগবে ডোপ টেস্ট। আবাসিক হলে পরিপূর্ণ আসন বরাদ্দ দেওয়ার পরেই সশরীরে ক্লাস শুরু করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

সাত বছর ধরে আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ থাকলেও এবার নতুন প্রশাসনের এমন উদ্যোগে উচ্ছ্বসিত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ ২০১৭ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়।

 এর দুই বছর পর ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক হলগুলোতে আসন বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিলেও তা অদৃশ্য কারণে হয়ে ওঠেনি। পরে ২০২২ সালেও আসন বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে আগস্টে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদত্যাগের হিড়িক পড়ে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ সবকটি প্রশাসনিক পদের কর্তাব্যক্তি। পরে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলে আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ দেওয়াসহ ৬ অক্টোবর থেকে সশরীরে ক্লাসের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর আগামী রবিবার থেকে পুরোপুরি সচল হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের ক্লাস-পরীক্ষা। আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হলে গত ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। বন্ধ ঘোষণা করা হয় আবাসিক হলও। এরপর ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চবি প্রশাসনের পদত্যাগের দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা। তোপের মুখে ১২ আগস্ট পদত্যাগ করে প্রশাসন। ফলে অচল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলে একে একে নিতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আবাসিক হলে আসন বরাদ্দের ফলে আবাসন সংকট নিরসনে আশায় স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থীদের মনে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ছয় দশক হতে চললেও কেন দেশের সবচেয়ে বড় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন সুবিধা নেই এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবাসন সংকট নিরসন করা গেলে শিক্ষার মান এবং পরিবেশ আরও উন্নত হবে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হবে, গবেষণামুখী হবে। শতভাগ আবাসন সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে টিউশন কিংবা অন্যান্য অর্থের আয়ের পথ বেছে নিতে হয়। কেননা ক্যাম্পাসে যেসব কটেজ বা বাসা রয়েছে সেখানে আবাসন সুবিধা নিম্নমানের এবং বেশ ব্যয়বহুল। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবাসন সুবিধা শতভাগ না থাকায় একজন সাধারণ শিক্ষার্থী পুরোপুরিভাবে গবেষণা কিংবা পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারেন না।

এদিকে আবাসিক হল মাদকমুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। আবাসিক হলে বরাদ্দ হওয়া শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্ট দিতে হবে। ডোপ টেস্টে উত্তীর্ণ হয়ে একজন শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকতে পারবেন। অন্যথায় তাকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল ছিল মাদকের আখড়া। প্রশাসনের কোনো প্রকার পরোয়া করতেন না তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। নির্দ্বিধায় আবাসিক হলে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন তারা। আবাসিক হল মাদকের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ পেলেও একজন শিক্ষার্থীকে শুরুতেই আসন দেওয়া হবে না। আসন বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাধ্যতামূলক রক্তে মাদকের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে। যদি তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তবেই আবাসিক হলে থাকতে পারবেন। মাদকের উপস্থিতি পাওয়া গেলে তাকে আর আসন বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মাদকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও আসন বরাদ্দ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারাবি তাশরীফ বলেন, আবাসিক হলে আসন দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন পর। আমরা খুশি। কারণ এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো ছিল ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। তাদের হুকুমেই চলত আবাসিক হলের আসন বরাদ্দসহ সবকিছু। তা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাত বছর পর আসন বরাদ্দ দিয়েছে, এটা অনেক বড় বিষয়। তিনি আরও বলেন, শুধু মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হলে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও দূরত্ব বিবেচনা নিয়ে আবাসিক হলের আসন বরাদ্দ দেওয়া হলে ভালো হতো।

মাদকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আতিক বলেন, এটা বেশ ভালো উদ্যোগ। এমন ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় হবে মাদকমুক্ত। তৈরি হবে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনা মনোযোগী হবে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, আসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি দূরত্ব ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনার করার দাবিটি যৌক্তিক। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে খুব দ্রুত সশরীরে ক্লাস কার্যক্রম চালু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। এজন্য আগে আমাদের হলগুলো চালু করতে হবে। কিন্তু আর্থিক অবস্থা ও দূরত্ব বিবেচনা করতে গেলে অনেক দীর্ঘ একটি সময়ের প্রয়োজন। সেই পরিমাণ সময় এখন আমাদের নেই। আমরা এবার অন্তত মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দিয়ে ক্লাস কার্যক্রম চালু করে দিই। পরে আমরা মেধার পাশাপাশি, দূরত্ব ও আর্থিক অবস্থাও বিবেচনায় রাখার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত