আমরা কি তোমাদের মতো মানুষ নই

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:১৫ পিএম

গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন স্তব্ধ করে দিয়েছে অনেক কণ্ঠ। যারা এখনো বেঁচে আছেন, তারা চাচ্ছেন মুক্তি। গাজার সেই অসহায় কণ্ঠস্বরের আকুতি নিয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

গাজা, প্রায় ২.৩ মিলিয়ন মানুষের আবাসস্থল, তবে এক বছর আগে এ এলাকা যেমন ছিল, এখন আর তা নেই। ইসরায়েলি হামলা পুরো এলাকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, শতাব্দীর পুরনো মসজিদ ও গির্জা ধসিয়ে দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কৃষিজমি ধ্বংস করেছে। মাত্র ৩৬৫ বর্গ কিমি বা ১৪১ বর্গমাইলের এই ছোট এলাকায় ধ্বংসের মাত্রা এতটা বিশাল যে অনেক বাসিন্দা বাড়িতে ফিরতে পারে না এবং সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে কখনো ফিরতে পারবেও না। আলজাজিরা জানাচ্ছে, যেমন উত্তর গাজায় অবস্থিত আট শরণার্থী শিবিরের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জাবালিয়া। ১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদী সামরিক বাহিনী ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর থেকে বাস্তুচ্যুত করার পরে শিবিরটি স্থাপিত হয়। মাত্র এক দশমিক চার বর্গ কিমি এলাকা নিয়ে স্থাপিত এ শিবির। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এসব শিবিরে হামলা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দুই হাজার পাউন্ড বোমা দিয়ে। শত শত শরণার্থী নিহত হয়েছে তাদের হামলায়। এসব বোমার আঘাত সবচেয়ে বড় এবং ধ্বংসাত্মক। একেকটি গোলার আঘাতে ৪০ ফুটের বেশি ব্যাসের গর্ত তৈরি হয়েছে। শুধু শরণার্থী শিবির নয়, জাবালিয়া থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে গাজার পুরাতন শহরও হামলার শিকার হয়েছে। এ শহরটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীনতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্থান। যেখানে ৫ম শতাব্দীর বাড়িঘরও রয়েছে। এখানে উপাসনালয়ের মধ্যে রয়েছে গ্রেট ওমারি মসজিদ এবং গির্জা সেন্ট ফিলিপ দ্য ইভাঞ্জেলিস্ট চ্যাপেল এবং চার্চ অব সেন্ট পোরফিরিয়াস। গত ৮ ডিসেম্বর ইসরায়েলি বিমান হামলায় গাজার গ্রেট ওমারি মসজিদ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এ ছাড়া প্রায় সাড়ে ৭০০ বছরের পাঠাগার ধ্বংস হয়। যাতে পবিত্র কোরআনের পুরনো কপিসহ দুর্লভ পা-ুলিপি ছিল। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি।

গাজা থেকে...

গাজার ধ্বংসস্তূপে বসবাসকারী অনেকে এখনো মুক্তির আশা ছেড়ে দেননি। তারা এখনো জীবনের বাকিটা সময় গুছিয়ে নিতে চান। তাদেরই একজন লিখেছেন দ্য গার্ডিয়ানে। তার লেখার শুরুটা এমন, ‘গাজায় বসবাস আমাকে জীবনের প্রতি গভীর এবং চ্যালেঞ্জিং দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আমি এমন একজন ব্যক্তি যে সাধারণত ভয় পায় না, কিন্তু এখন আমরা যা দেখছি এবং শুনছি তা খুব ভীতিকর। এমনকি রাতে আমাদের মাথার ওপরের বাড়িটি যদি ভেঙে পড়ে তাহলে কোথায় যাব সেই দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে যেতে হয়। গাজায় সব জায়গায়ই অনিরাপদ। বোমা বিস্ফোরণ থেকে আমরা দূরে নই এবং মৃত্যু কখনো আমাদের থেকে দূরে নয়।’

তিনি লিখছেন, আমি সারা জীবন গাজায় বসবাস করেছি, কিন্তু আমাকে ২০২৩ সালের অক্টোবরে আমার বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছিল। এ মুহূর্তে আমি আমার পরিবারের সঙ্গে পূর্ব গাজায় বসবাস করছি। এক ঘরে আমরা সাতজন আর অন্য ঘরে সাতজনের আরেকটি পরিবার। আমরা যতটা সম্ভব উষ্ণ থাকার চেষ্টা করি। আমরা একে অপরের পাশে ঘনিষ্ঠভাবে ঘুমাই। আমাদের পুরো বাড়িতে পানি নেই এবং খাবারের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ময়দা ব্যয়বহুল এবং দুষ্প্রাপ্য, তাই মাঝে মাঝে আমাদের খাওয়ার জন্য পশুখাদ্য ব্যবহার করতে হয়েছিল। আমি আমার বোনদের দেখে কষ্ট পাই কারণ তারা তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে না। তারা শিশু এবং তাদের শরীর বৃদ্ধি পাওয়ার সময় এখন, (খাবারের অভাবে) তারা প্রায়ই ক্লান্ত বোধ করে।

কোনো উত্তর নেই

ওই তরুণী দ্য গার্ডিয়ানে লেখা চিঠিতে নিজের নাম প্রকাশ করেননি নিরাপত্তার স্বার্থে। তবে নিজের অনুভূতির পুরোটা তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আমাদের মতো তরুণদের জন্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস সারা জীবনের জন্য স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে সবকিছু বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে; আমরা যা দেখি ও শুনি এবং এমনকি যেখানে আমরা বাস করি। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ পরিবেশে আমাদের প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ। অনেক শিশু সহিংসতার সাক্ষী এবং প্রিয়জন হারানোর কারণে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে। তার ওপর অর্থনৈতিক পতন এবং অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তরুণদের পক্ষে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ কল্পনা বা স্বাভাবিক জীবনের পরিকল্পনা কঠিন করে তুলেছে। আমরা আমাদের স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা পূরণে অনেক বাধার সম্মুখীন হই, এমনকি সাধারণ ইচ্ছা পূরণও করা কঠিন। যেমন ভিসার জন্য আবেদন করতে গেলে চেকপয়েন্ট পার হতে হয়, অপমানজনক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, এরপর দীর্ঘ নিয়ম মানলেও বেশিরভাগ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমি পশ্চিম এবং ইসরায়েলের লোকদের একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই ‘আমরা কি তোমাদের মতো মানুষ নই?’ আর উত্তর হচ্ছে, কোনো উত্তর নেই। এখানে জীবন অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে কারণ কিছুই আর সাধারণ নয়। এই রূঢ় বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য তরুণরা বেঁচে থাকার বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। আমরা প্রতিটা দিন আলাদা করে বেঁচে থাকি, ছোট ছোট আনন্দ এবং ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পাই। ব্যক্তিগত জগৎ তৈরি এবং ব্যক্তিগত পছন্দের কার্যকলাপে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে একটি সাময়িকভাবে পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। আশা এবং স্বপ্ন ধরে রাখা বেঁচে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে জানার পরও, অন্ধকার পরিস্থিতি সত্ত্বেও, এসব স্বপ্ন আমাদের কষ্ট সহ্য করার এবং এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। আমি এখনো করতে চাই এমন অনেক কিছু আছে, যেমন আমি একজন ফটোগ্রাফার হতে চাই। আমি লিখিও। আমি খুব নিশ্চিত যে, একদিন আমি এমন একটি বই লিখব যা সারা বিশ্ব দেখবে।

বাঁচতে চাই

ওই তরুণী আরও লিখছেন, বেঁচে থাকলে আমি বাইরের পৃথিবী দেখব। আমি যা পড়েছি সব দেখব। আমি খুব কৌতূহলী মানুষ, আমি আমার দেশের বাইরের বিশ্বের সবকিছু জানতে চাই। আমি স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই। আমি ইতিবাচকভাবে সব ভাবার চেষ্টা করি। যেমন যুদ্ধ শেষ হলে, আমি রাস্তায় বের হয়ে আবার নিরাপদ বোধ করতে পারব, যদিও আমি জানি না এটা কতটা সম্ভব বা আমি যুদ্ধের পরেও বেঁচে থাকব কি না। কিন্তু একটি জিনিস যা আমাকে আশাবাদী হতে দিচ্ছে না তা হলো, আমাদের প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে এবং সবাই আমাদের উপেক্ষা করছে বলে পরিস্থিতি অনুভব করছে না। সংঘাতের মূল কারণ মোকাবিলার জন্য রাজনৈতিক সমাধান এবং শান্তি আলোচনার পক্ষে সমর্থন বিশ্বের জন্য অপরিহার্য। আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে বেঁচে

থাকার জন্য এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা মানবিক সাহায্য যেমন খাদ্য, চিকিৎসাসেবা এবং মানসিক সহায়তা পাই। তবে আমাদের শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নিরাপদ স্থান প্রয়োজন, একটি আশ্রয় প্রয়োজন এবং তরুণদের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য সহায়তা প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি যে আশা আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে এটি কঠিন। গাজায় আমরা এমন অনুভূতি পাই না যে কেউ আমাদের খোঁজ করছে। গাজার তরুণরা মনে করে যে তারা বহির্বিশ্ব দ্বারা পরিত্যক্ত সংঘাত চলছে এবং চলছে; আমাদের সঙ্গে যা ঘটছে তাতে কেউ আর হতবাক হই না। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি যে কেউ আমাদের বলবে, যুদ্ধ শেষ।

স্থায়ী ক্ষতি

তবে গাজায় ইসরায়েলি হামলার কবলে পড়া শিশুরা স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে। গবেষকরা বলছেন, জন্মের পর প্রথম দুই বছরে শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত হারে বিকাশ লাভ করে। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার ইউনিসেফের পুষ্টি বিষয়ক উপদেষ্টা আশিমা গার্গ বলছেন, এ সময় অনাহারে বা অপুষ্টিতে থাকলে শিশুর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিকাশ বাধা পায়। তিনি বলেন, যদি তারা বেঁচেও থাকে, তাহলে শৈশবে এবং তার পরেও শারীরিক ও মানসিকভাবে উন্নতি করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীর যখন পর্যাপ্ত পুষ্টি পায়, তখন তার বিপাক ক্রিয়া নিয়মিতভাবে কাজ করে। শক্তি সরবরাহ করতে এবং শরীরের কার্যকারিতা যেমন বেড়ে ওঠা, টিস্যু মেরামত এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখতে খাদ্য ভেঙে ফেলা হয়। একদিন খাবার ছাড়া শরীর তার প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে সঞ্চিত গ্লুকোজ ব্যবহার করে। তখন গ্লুকাগন নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা লিভারকে আরও গ্লুকোজ তৈরির নির্দেশ দেয়, যা প্রাথমিকভাবে মস্তিষ্কে জ্বালানি দিতে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রথম কয়েক দিন পর শরীর শক্তির জন্য চর্বি টিস্যু ভাঙতে শুরু করে। পেশিগুলো তাদের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে এ প্রক্রিয়ার সময় উৎপাদিত ফ্যাটি অ্যাসিড ব্যবহার করে। এ ফ্যাটি অ্যাসিডগুলো লিভারে কেটোন তৈরি করে, যা রক্তপ্রবাহে মুক্তি পায় এবং মস্তিষ্ক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তবে যত কম খাবার শরীরে প্রবেশ করবে, তত শরীরের জন্য এই জরুরি উপাদানের নিঃসরণ প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে। যা অপুষ্টি এবং এ সংক্রান্ত মৃত্যুর জন্য দায়ী। নির্মম ইসরায়েলি হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া গাজার শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ তাই অনিশ্চিত। এ জন্যই গার্ডিয়ানের সেই তরুণী লিখেছেন, তারা হয়তো যথেষ্ট মানুষ নয়। মানুষ হলে এভাবে বিশ্ব চুপ থাকতে পারত না। তাদের অসহায়ত্ব দীর্ঘ হতো না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত