পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গতকাল সোমবার এসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্বাক্ষরিত আদেশে এ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে এসইসি। এসইসি গঠিত পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭টি। তবে পরে আরও কোনো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে টাস্কফোর্সের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কার্যপরিধি বাড়াতে পারবে এসইসি।
তবে সিকিউরিটিজ আইনের কোন ক্ষমতাবলে টাস্কফার্স গঠন করা হয়েছে, তা উল্লেখ করেনি এসইসি। সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, কোনো সংস্কারের প্রয়োজন হলে পরামর্শক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এদিকে টাস্কফোর্স গঠন হলেও কত দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন বা সুপারিশ কমিশনের কাছে জমা দেবে, সেটিও উল্লেখ নেই। শুধু বলা হয়েছে, সব পক্ষের মতামত বিবেচনাপূর্বক একটি যৌক্তিক সময়ে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করবে।
এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অনেক কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স) দেওয়া হয়েছে, তাই সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। কমিটির সদস্যরা সবাই নিজ নিজ পেশায় রয়েছেন, তাদের একটু কমফোর্ট দিতেই সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি।
পুঁজিবাজার সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্যরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান, হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির সিনিয়র পার্টনার এএফএম নেসার উদ্দীন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা আকবর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন।
টাস্কফোর্স গঠন প্রসঙ্গে এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে যাদের নেওয়া হয়েছে, তারা প্রায় সবাই শিক্ষক। বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে নেওয়া হলে ভালো হতো।
এসইসি জানিয়েছে, পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স অবিলম্বে কার্যক্রম শুরু করবে। তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে যৌক্তিক সময়ে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন (বিদ্যমান কাঠামো পর্যালোচনাপূর্বক প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের নিমিত্ত সুপারিশ প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়াদি) এসইসির কাছে হস্তান্তর করবে।
এসইসিসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান, যেমন ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, সিসিবিএলসহ বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য পক্ষ টাস্কফোর্সের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহসহ সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এসইসি টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।
টাস্কফোর্সের অধীনে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক ফোকাস গ্রুপ থাকবে। প্রতিটি ফোকাস গ্রুপ নির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে টাস্কফোর্সকে সুপারিশ করবে। কমিশনকে অবহিত করে টাস্কফোর্স উপযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ফোকাস গ্রুপ গঠন করবে। এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাজারের প্রধান প্রধান দিক বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে। বর্তমান বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই পুঁজিবাজার গঠনের জন্য এ টাস্কফোর্স অপরিহার্য।
টাস্কফোর্সের কার্যপরিধি : এ টাস্কফোর্সের মূল দায়িত্ব হবে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করা। এজন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আকার তথা ‘জিডিপি ও বাজার মূলধন’-এর অনুপাত কম হওয়ার প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করে উত্তরণের জন্য সরকারের আর্থিক খাতের নীতি প্রণয়নের প্রস্তাবনা দেবে টাস্কফোর্স। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের জন্য সরকারের আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিশনের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা; সুশাসন উন্নীত করার লক্ষ্যে পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা ও সমাধানের সুপারিশমালা প্রণয়ন করবে।
এসইসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ, অভ্যন্তরীণ সুশাসন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে প্রযুক্তি ও অটোমেশনের প্রয়োগ, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে এসইসির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অন্যান্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর সুপারিশ, মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কমিশনের কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, সেমিনার, কর্মশালায় অংশগ্রহণসহ অভ্যন্তরীণ অন্যান্য বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করবে টাস্কফোর্স। ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, সিসিবিএলের তদারকি কার্যক্রম বিশ্বমানে উন্নীত করাসহ উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুগোপযোগী করার সুপারিশ প্রণয়ন; প্রাইভেট প্লেসমেন্ট/অফারের মাধ্যমে ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যু-সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ইস্যু অব ক্যাপিটাল) রুলস, ২০০১ যুগোপযোগী করার সুপারিশ প্রণয়ন করা।
টাস্কফোর্সের কার্যপরিধিতে রয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, করপোরেট ডিজক্লোজার, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের সঠিকতা নিশ্চিত করাসহ করপোরেট গভর্ন্যান্স, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজারের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন; ডেট ও ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যুর আবেদনের ক্ষেত্রে দাখিলকৃত তথ্য-উপাত্ত, দলিল-দস্তাবেজ, সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদন, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে প্রস্তুতকারী পক্ষসমূহ, যেমন ইস্যুয়ার কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার ও আন্ডার রাইটার (মার্চেন্ট ব্যাংকার), ডেল্যুয়ার এবং অডিটরসহ অন্যান্য পক্ষের দায়-দায়িত্ব ও সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন।
এ ছাড়া বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি ডেট ও ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যু-সংক্রান্ত বিধিবিধান যুগোপযোগী করার সুপারিশ প্রণয়ন করবে। বাজারে কারসাজি, সুবিধাভোগী ব্যবসায় লেনদেন ও অন্যান্য অনিয়মের বিচার ও জরিমানায় সমতা আনয়নের জন্য বিদ্যমান আইনের শাস্তির ধারার অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট পেনাল কোড বা শান্তির বিধিমালা প্রণয়ন করা। বর্তমান বাজার কাঠামোর মূল্যায়ন, বাজারের গভীরতা, তারল্য ও পণ্য বৈচিত্র্যকে বিবেচনাপূর্বক দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কীভাবে আরও আকৃষ্ট করা যায়, সেই কৌশল প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর (বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইডিআরএ, এমআরএ, এনবিআর, আরজেএসসি ইত্যাদি) সঙ্গে সমন্বয়ের উপায় নির্ধারণে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি বা নির্দেশিকা প্রণয়ন।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানি বা তালিকাভুক্ত কোম্পানির মার্জার, অ্যামালগামেশন, ইকুইজেশনের মাধ্যমে কোনো শেয়ার ইস্যু-সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে এতদসংক্রান্ত স্কিম অনুমোদনের পূর্বে এসইসি থেকে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ বিষয়ে সুপারিশমালা প্রণয়ন। এ ছাড়া টাস্কফোর্সের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি কার্যপরিধিতে সংযোজন করা যাবে।
