শিক্ষায় ফেরা অনিশ্চিত ছাত্রলীগের

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:২০ এএম

মধ্য জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা করার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের এসব নেতাকর্মী আর ফিরতে পারেননি।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। তারা চাচ্ছেন না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ফিরুক। তবে ছাত্রলীগের এমন অনেক নেতাকর্মী রয়েছেন যারা সরাসরি হামলায় জড়িত ছিলেন না, কিন্তু পদত্যাগ না করায় তাদেরও অবাঞ্ছিতের তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে ক্লাস-পরীক্ষা সচল হলেও অংশগ্রহণ করত পারছেন না তারা। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের শিক্ষাজীবন।

গত ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হামলা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী আহত হন। লাঞ্ছিত করা হয় নারী শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর জের ধরে হল ও ক্যাম্পাস থেকে তাদের বিতাড়িত করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে এর মধ্যে অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেন। হামলার প্রতিবাদে ছাত্রলীগের পদ ছাড়েন অনেক নেতা।

ছাত্রলীগের যাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে তাদের অনেকের স্নাতক শেষ হয়েছে, কিন্তু স্নাতকোত্তর এখনো বাকি রয়েছে। আবার অনেকের স্নাতকই শেষ হয়নি। এমন কয়েকজন ক্লাস পরীক্ষা দিতে এলে তাদের বাধা দেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিল কিন্তু হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল না এমন কেউ এলেও তাদের শিক্ষার্থীরা পাকড়াও করছেন। তবে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে পদত্যাগ করা ছাত্রলীগ নেতাদের ক্লাস করা বা হলে থাকায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

গত ২ অক্টোবর চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই ছাত্রলীগ নেতা। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তাদের ইবি থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। আটক দুই ছাত্রলীগ নেতা হলেন ইবি ছাত্রলীগের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয় সম্পাদক শাহিনুর পাশা এবং নাট্য ও বিতর্ক সম্পাদক আল-আমিন। ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে এসে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মী। তারা হলেন রাহিমুল ইসলাম শুভ, ওয়াসি-উজ জামান সোহাগ ও তানজিলা মোবাশে^রা স্বর্ণালী। শিক্ষার্থী নির্যাতনের সঙ্গে তারা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক নেতাকর্মী ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ছাত্রী ও নারী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক নোশিন শর্মিলী এবং জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের আইন সম্পাদক অনিন্দ্য দাসকে পরীক্ষায় বসতে দিতে চান না আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তারা সরাসরি হামলায় জড়িত থাকায় বহিষ্কার এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত ১৪ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছাত্রলীগের এক নেতা তার জিনিসপত্র নিতে এলে তাকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন ও মারধরও করা হয়। পরে হল প্রাধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের ওই নেতার কাছে লিখিতভাবে অঙ্গীকারনামা নেন। পাশাপাশি তাকে রাজশাহী ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। সেদিনই ছাত্রলীগের ওই নেতা রাজশাহী ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। অথচ তার স্নাতকোত্তর শেষ হয়নি এখনো।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, আন্দোলনে সরাসরি হামলাকারী সন্ত্রাসীদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে বসে ক্লাস করার নৈতিক অধিকার নেই। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। যারা হামলায় অংশগ্রহণ করেননি, কিন্তু হামলার পরেও ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করেননি তারাও সমান অপরাধী। কারণ তারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ছাত্রলীগের কর্মকা-কে সমর্থন করেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি, শিক্ষার্থী নির্যাতন, হলে ক্যান্টিনে ফাও খাওয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা- যুক্ত ছিলেন। এজন্য তারা ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। ছাত্রলীগের এসব দোসর ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলে তারা ক্লাস-পরীক্ষা বয়কট করবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা সাবরিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা শিক্ষার্থীদের একটি ন্যায্য দাবির আন্দোলনে কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই হামলা করেছিল। এমনকি তারা নারী শিক্ষার্থীদের ওপরও চড়াও হয়েছিল। তাদের সঙ্গে একই ক্লাসরুমে বসে ক্লাস করলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে হামলার শিকার নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এ ছাড়া তাদের বিচারের মুখোমুখি না করেই যদি ক্লাস করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে হামলায় নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও এক ধরনের অবিচার করা হবে।

এদিকে হামলায় জড়িত না থাকলেও ছাত্রলীগের পদ থেকে পদত্যাগ না করায় অনেক শিক্ষার্থী আবাসিক হলে এবং ক্লাসে ফিরতে পারছেন না। ক্লাস করতে গেলে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিব রহমান ক্লাস করতে গেলে প্রায় সব শিক্ষার্থী বের হয়ে যান। পরে আর কোনো ক্লাস করতে পারেননি হাবিব। পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। দেশ রূপান্তরকে হাবিব বলেন, ‘আমি কখনো ছাত্র নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। রাজনীতিতেও সেভাবে সক্রিয় ছিলাম না। ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে আমাকে ক্লাস থেকে বিরত রাখে শিক্ষার্থীদের একটি দল। আমি ক্লাস পরীক্ষায় ফিরতে চাই, এটি আমার অধিকার।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করিনি বলে আমার সহপাঠীরা আমাকে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিচ্ছেন না। আমাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করছেন। আমাকে হলে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন। আমার স্নাতক এখনো শেষ হয়নি।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ বলেন, ‘যারা হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল তাদের বিচারের দাবি জানিয়েছি আমরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটির ব্যবস্থা নিচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও তাদের বয়কট করছে। তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। যারা হামলায় ছিল না, শিক্ষার্থী নির্যাতন করেনি এবং গণহত্যাকে সমর্থন জানায়নি, তাদের ক্লাস-পরীক্ষায় কোনো সমস্যা নেই। অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটলে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখবে।’

আরেক সমন্বয়ক হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘যারা প্রকৃত দোষী তাদের বিচার দাবি করছি আমরা। আমরা নিজেরা নই, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আর যারা নির্দোষ তাদের যাতে কোনো প্রকার হয়রানি না করা হয়, সেই দাবিও জানাচ্ছি আমরা।’

বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহেদ বলেন, ‘হামলায় অংশগ্রহণকারীদের ফুটেজ থেকে শনাক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

গত ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘটিত সহিংস ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে চার সদস্যের একটি সত্যানুসন্ধান কমিটি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা হামলায় ছিল তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। যারা হামলায় ছিল না তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও আমাদের নজর রয়েছে।’

যেসব ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর শিক্ষা কার্যক্রম শেষ হয়নি, তারা ক্যাম্পাসে আসতে পারবেন কি না এবং তারা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন কি না এমন প্রশ্নে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ বলেন, ‘অবশ্যই পারবেন। তবে কেউ যদি ক্যাম্পাসে আসতে অনিরাপদ বোধ করেন, তিনি যেন আমাদের জানিয়ে আসেন। একা একা বা চুপি চুপি না আসেন। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের কাছে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই সমান।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, ‘আমরা এ বিষয়টি সমাধানের বিষয়ে ভাবছি। এ সপ্তাহের মধ্যেই উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘আমরা এ বিষয়টি সমাধান নিয়ে ভাবছি। আমাদের আরও কিছু সময় লাগবে।’

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত