বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। শেরপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস বলছে, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। জেলা প্রশাসন জানায়, ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন করা হবে। এদিকে নেত্রকোনার পাঁচটি উপজেলার অনন্ত ২৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বন্যার পানি গত চার দিন ধরে নামতে শুরু করেছে। তবে এখনো বিভিন্ন রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আমন ধানক্ষেত, শাকসবজির ক্ষেত, ঘরবাড়িতে পানিসহ অনেক মানুষ এখনো পানিবন্দি। এর মধ্য দিয়ে ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। এ ছাড়া ময়মনসিংহের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে দুর্গত মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
শেরপুর : শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উজান এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের বসতঘর, আমন আবাদ, সবজি বাগান এবং মাছের প্রজেক্ট। পাহাড়ি অঞ্চল (উজান) এবং নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ি এই ঢলের পানিতে মানুষের বসতঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। আবার কোনো কোনো ঘর পানির স্রোতে ভেসে গেছে। অনেক সবজিক্ষেত পানিতে ধুয়ে গেছে। প্রজেক্ট থেকে বন্যার পানিতে সব মাছ ভেসে গেছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা জানায়, তাদের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে, সবজির আবাদ নষ্ট হয়েছে। পুকুরের মাছ চলে গেছে। এখন তারা নিঃস্ব। দ্রুতই তারা সরকারের সহযোগিতা চায়।
নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আধা শতাংশ জায়গার ওপর আমার দুটি ঘর ছিল। দুটি ঘরই ভেঙে গেছে। আমার ঘরে আটজন খাওয়ার মানুষ, বয়স্ক পিতা-মাতা আছে, চারটা সন্তান আছে। আমি দিনমজুর। এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বার কোনো খোঁজখবর নেননি। আমি সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই।’
নালিতাবাড়ী পলাশীকুড়া গ্রামের মাছের প্রজেক্ট মালিক বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমার নয়টা পুকুর। এই পুকুরে ১০ লাখ টাকার মাছ ছেড়েছিলাম। এখন একটা মাছও নেই। এই মাছের ব্যবসা করতে গিয়ে আমার অনেক ধারদেনা হয়েছে, সরকারের কাছে আবেদন, যদি আমাকে ব্যাংক থেকে লোন দেওয়া হয় তাহলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস এবং জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, শেরপুর জেলায় কৃষিতে সবজি ১ হাজার ৬২ হেক্টর, রোপা আমন ৪৬ হাজার ৭৯০ হেক্টর, ৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৯৪ বস্তা আদা এবং ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৩০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য অফিস জানায়, ৭ হাজার ৩৬৪টি পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে এবং এখান থেকে সব মাছ ভেসে গেছে।
শেরপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সুচি রানী সাহা বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত আছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি, কাজ চলমান আছে।’
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। প্রত্যেক উপজেলায় ডি ফরম দেওয়া হয়েছে। ওই ফরমে কৃষকরা আবেদন করলে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা পাবে।’
নেত্রকোনায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক : জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় অন্তত সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর আমন ধানক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এসব ক্ষেতের ধানগাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৯৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং ১৮৭ হেক্টর জমির সবজিও বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে।
নেত্রকোনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৮৪ হাজার ১৬৫ হেক্টর। বন্যাদুর্গত উপজেলাগুলোর ৩১২ হেক্টর জমিতে অন্তত ১ হাজার ৪৮০টি পুকুর ও খামারের ৭২৩ টন মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। এ কারণে ৮৯৬ জন চাষি প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও সদর উপজেলার।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এজিইডি) নেত্রকোনা কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জেলায় এলজিইডির আওতাধীন ৫ হাজার ৯৫৩ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১ হাজার ৬৩৮ কিলোমিটার পিচঢালা সড়ক। বাকিগুলো সিসি, আরসিসি, মেগাটম, কার্পেটিং ও কাঁচা সড়ক। পানিতে তলিয়ে যাওয়া যেসব সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে, অধিকাংশ সড়ক ব্যবহার করা যাচ্ছে না। স্রোতে স্থানে স্থানে ভেঙে গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাকা সেতু, বক্স কালভার্টসহ সংযোগ সড়ক বন্যায় ধসে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।
জেলা প্রশাসক বনানী বিশ্বাস জানান, বন্যার পানি এখন দ্রুতই নেমে যাচ্ছে। আশা করছেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যাদের ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, তাদের তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। এ পর্যন্ত ১০০ টন চাল, শিশুখাদ্য ও গো-খাদ্যের জন্য ৫ লাখ টাকাসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরছে মানুষ : ময়মনসিংহের ফুলপুর, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ময়মনসিংহের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে দুর্গত মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তবে প্রায় সব এলাকায়ই খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রীর পাশাপাশি চিকিৎসা সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, বন্যায় প্রায় দুই লাখ মানুষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। পানি ঢুকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিকারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে দুর্গত মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে।
হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরশাদুল আহমেদ জানান, উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা থেকেই পানি নেমে গেছে। তবে নিচু এলাকাগুলো থেকে পানি ধীরে ধীরে নামছে।
ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত শারমিন জানান, উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে কিছু এলাকা থেকে পানি ধীরে নামছে। ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আরিফুল ইসলাম বলেন, এলাকায় পানি কমেছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে লোকজন বাড়ি ফিরছে। সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, বন্যার কারণে জেলার তিন উপজেলায় ৩৫৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাঠদানে বাধ্যবাধকতা নেই। যদিও এখন পূজা উপলক্ষে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে।
