ভারতের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং। গতকাল রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে কুখ্যাত বিষ্ণোই গ্যাং। গত শনিবার রাতে মুম্বাইয়ের পূর্ব বান্দ্রার বিধায়ক ছেলে জিশান সিদ্দিকীর কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর বাবা সিদ্দিকী ও তার সহযোগীর ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে স্থানীয় লীলাবতী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ৬৬ বছর বয়সী জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির এই নেতার। শিবু লঙ্কার নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টটির বিষয়ে তদন্ত করছে ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো। তদন্তকারীদের ধারণা, অ্যাকাউন্টটি বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সহযোগী শুভম রামেশ্বর লঙ্কারের। বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগে শুভমকে চলতি বছরের শুরুতে মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে দুজনকে আটক করে পুলিশ। আটকদের মধ্যে কর্নেইল সিংহ হরিয়ানার এবং ধরমরাজ কাশ্যপ উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা। এ ঘটনায় শিব কুমার গৌতম নামে আরও একজনের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। অভিযুক্ত দুই বন্দুকধারীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আর পলাতক শিব কুমারকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ শাখা। পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীরা দুই মাস ধরে মুম্বাইয়ের কুরলা এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন। এ সময় বাবা সিদ্দিকীর ওপর নজর রাখছিলেন এবং হামলার জায়গাটি রেকি করেছিলেন। পরিকল্পিত এই হত্যার কয়েক দিন আগে কুরিয়ারের মাধ্যমে অস্ত্র পেয়েছিলেন তারা। বাবা সিদ্দিকীকে হত্যার জন্য শুটারদের অগ্রিম তিন লাখ রুপি দেওয়া হয়েছিল। এই হত্যার চুক্তি নেওয়া চারজনের মধ্যে অর্থ ভাগ হওয়ার কথা। চতুর্থ ব্যক্তিকে এই হত্যাকাণ্ডের সমন্বয়ক হিসেবে ধারণা করছে মুম্বাই পুলিশ। তবে কী কারণে বাবা সিদ্দিকীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত দুজনেরই নিজের শহরে নথিবদ্ধ অপরাধের তথ্য নেই। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবর, পাঞ্জাবের একটি কারাগারে থাকার সময় দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল। তারা বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে কুখ্যাতি অর্জন করতে চেয়েছিল। অপরাধ জগতে প্রবেশের আগে পুনেতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তারা।
দল-মত নির্বিশেষে বাবা সিদ্দিকীর অবস্থান থাকায় তার হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্রবীণ রাজনীতিকরা এ ঘটনার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি মহারাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সিদ্দিকীর হত্যার ঘটনায় শোক জানানোর ‘ভাষা হারানোর’ কথা বলেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। এক্স পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শোক জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। এই শোকের মুহূর্তে আমি তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সমর্থকদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাবা সিদ্দিকীজির এই করুণ মৃত্যু মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। এই কঠিন সময়ে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা রইল। সেই সঙ্গে মহারাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং সরকারকে অবশ্যই এর দায় নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন রাহুল।
মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী ও এনসিপির প্রধান অজিত পাওয়ার বাবা সিদ্দিকীর হত্যাকাণ্ডকে দুর্ভাগ্যজনক ও নিন্দনীয় উল্লেখ বলে করেছেন। তিনি বলেন, একজন ভালো বন্ধু ও সহকর্মীকে হারিয়েছি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য লড়াই ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে আপসহীন এই নেতার মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হবে বলে এক্সে দেওয়া পোস্টে লেখেন অজিত পাওয়ার।
বাবা সিদ্দিকী প্রায় পাঁচ দশক কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এনসিপিতে (অজিত পাওয়ার) যোগ দেন। সিদ্দিকী মহারাষ্ট্রের বান্দ্রা পশ্চিম নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিলাসরাও দেশমুখের অধীনে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি খাদ্য ও বেসামরিক সেবা সরবরাহ এবং শ্রম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের পর তার ঘনিষ্ঠ বলিউড তারকা সালমান খানের মুম্বাইয়ের বাসায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ।
