দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামোয় মন্ত্রীর কোনো পদ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ‘মন্ত্রী’ ও সচিবের নাম ভাঙিয়ে ফেনী সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের কেনাবেচাসহ যেকোনো কিছুর নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করতে হলে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরেও এই সরকারি দপ্তরে বাড়তি অর্থ গুনতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। আর চাহিদা অনুযায়ী বাড়তি অর্থ না দিলে নানা অজুহাতে রেজিস্ট্রেশনের জন্য মাসের পর মাস ঘোরানো হয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গড়ে প্রতিদিন ৪০-৫০টি দলিল রেজিস্ট্রি হয়। এসব দলিলপ্রতি ঘুষ আদায় হয় গড়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন ঘুষ আদায় হয় ৫ লাখ টাকা। সাপ্তাহিক দুদিনের ছুটি বাদ দিলে মাসে ২২ কার্যদিবসে ঘুষ আদায়ের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা। এর বাইরে বড় ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন তো আছেই। বিপুল অঙ্কের এ ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারা হয় নানা ধাপে। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের টাকার ৫০ শতাংশ চলে যায় দপ্তরপ্রধান সাবরেজিস্ট্রার বোরহান উদ্দিন সরকারের পকেটে। বাকি টাকা ভাগাভাগি হয় দলিল লেখক, উমেদার, নকলনবিশ, অফিস সহকারী, মোহরার, এক্সট্রা মোহরার ও পিয়নের মধ্যে।
এ দপ্তরে ভুয়া নামজারি এবং প্রয়োজনীয় আরও কিছু জাল কাগজপত্র সৃষ্টি করে জমি রেজিস্ট্রির ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে ভিটি শ্রেণির জমিকে নালা ও ডোবা হিসেবে দেখানো হয়। আর ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির সময় রাজস্ব ফাঁকি দিতে মোটা অঙ্কের ঘুষের চুক্তি করা হয়। রাজস্ব ফাঁকি দিতে বহুতল ভবনকে কম উচ্চতার দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। জালিয়াতি করে রেজিস্ট্রির পর সেই দলিল দিয়ে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নেওয়ার উদাহরণও রয়েছে অনেক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দলিল লেখক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জমির শ্রেণি পরিবর্তন নিষিদ্ধ হলেও ঘুষ দিলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয় ফেনী সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। বড় অঙ্কের ঘুষ পেলে নাল জমিকে ভিটি উল্লেখ আর ভিটি জমি মুহূর্তেই বাড়িতে রূপান্তর হয়ে যায়। ওয়ারিশ নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতায় ঘুষ লেনদেন অবধারিত। দলিলের নকল তোলা, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জটিলতা ইত্যাদি কাজে ঘুষ লেনদেন বেশি হয়। এ ছাড়া জমি রেজিস্ট্রিতে স্থানীয় কর, উৎস কর এবং ৫৩/এইচ ও ৫৩/এফএফ কোড নিয়ে অস্পষ্টতার সুযোগে দুর্নীতি চলছে মহাসমারোহে। আবার পে-অর্ডার নিয়ে সরকারি গেজেটেও রয়েছে ধোঁয়াশা। কোন দলিলে উৎসে কর দিতে হবে, কোনটায় দিতে হবে না, কীভাবে দিতে হবে তা জানেন না অনেকেই। আর এর সুযোগ নিচ্ছে দুর্নীতিবাজরা।’
ভুক্তভোগী এক সেবাগ্রহীতা বলেন, দলিল রেজিস্ট্রি হলো একটি খুশির বিষয়। যিনি বিক্রি করেন, তিনি বিক্রির টাকা পেয়ে যেমন খুশি; তেমনই যিনি জমি বা সম্পদ কেনেন, তিনিও কিনতে পেরে খুশি হন।
যে কারণে কেনাবেচার সময় উভয়পক্ষ খুশি হয়ে দলিল রেজিস্ট্রি সংশ্লিষ্টদের হিসাবের বাইরে বকশিশ দিয়ে থাকেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে খুশি মনের বকশিশের অঙ্ক ঠিক থাকে না। নানারকম ভুলত্রুটির সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মোটা অঙ্কের বকশিশ (ঘুষ) আদায় করেন। আর জাল-জালিয়াতির বিষয় হলে তো কথাই নেই। সেখানে মোটা অঙ্কের ঘুষের চুক্তি করা হয়। এ ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখে দলিল লেখক ও উমেদাররা। যিনি জমি রেজিস্ট্রি করবেন, তাকে প্রথমে একজন দলিল লেখকের কাছে যেতে হবে। প্রথম ক্রাইম (অপরাধ) শুরু হয় দলিল লেখকের হাত দিয়ে। এরপর সেখানে যুক্ত হয় উমেদার। এজন্য রেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সম্পদশালী হলো একশ্রেণির দলিল লেখক ও উমেদার।
ভুক্তভোগী ওই সেবাগ্রহীতা আরও বলেন, রেজিস্ট্রি অফিসে বকশিশ বা শুভকাজের মিষ্টি খাওয়ানোর খরচ কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা। এর ওপরে যে যা নিতে পারেন। রেজিস্ট্রির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘুষের লম্বা ফর্দ শোনা যায় দালাল-কর্মচারীদের মুখে মুখে। যেমন রেজিস্ট্রির পর দলিলে টিপসই দেওয়া হলেই তাৎক্ষণিক এক হাজার টাকা দেওয়া দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। তাই আঙুলের ছাপ নেওয়ার পরপরই টাকার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারী। এমনকি দলিলের বান্ডিল সেলাইয়ে আছে বিশেষ বকশিশ। আর জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল কপি না থাকলে নগদ নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে পে-অর্ডার করতে বকশিশের নামে ঘুষ আদায়ের রেওয়াজ সম্প্রতি চালু হয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফেনী সদর হাসপাতালের পেছনে সুলতানপুর মৌজায় সোয়া চার শতক জায়গা হস্তান্তর করেন আহাছানুল নামে এক ব্যক্তি। আর এজন্য তিনি রিয়াজ উদ্দীন নামে একজনকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) দেন। অবশ্য এজন্য নির্ধারিত ফির বাইরে আরও ২০ হাজার টাকা বেশি দিতে হয়। ২০ হাজার টাকা বেশি কেন দিতে হবে জানতে চাইলে সাবরেজিস্ট্রার বোরহান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘মন্ত্রী-সচিবদের উপরি দিতে হয়।’ আর এ সময় তার দুই সহকারী বলেন, ‘মন্ত্রী-সচিবদের উপরি (ঘুষ) কি স্যারের পকেট থেকে দেবে?’ তখন সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘মন্ত্রী তো এখন নেই।’ এর উত্তরে সাবরেজিস্ট্রারের দুই সহকারী বলেন, ‘চেয়ার কি ফাঁকা!’
ফেনী সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক বলেন, সাবরেজিস্ট্রারের সঙ্গে কাজ করতে হলে তার চাহিদামতো সব করতে হয়। তা না হলে বিভিন্ন অজুহাতে দলিল আটকে দেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবরেজিস্ট্রার বোরহান উদ্দিন সরকারের সঙ্গে দেখা করলে প্রথমে তিনি তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে এজলাসের পাশেই বসতে বলেন এই প্রতিবেদককে। অবশ্য পরে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তার ইশারায় অফিসের কর্মচারী, দলিল লেখকসহ ১০-১৫ জনের একটি দল তেড়ে এসে এই প্রতিবেদককে সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে বের করে দেয়।
পরে আবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাবরেজিস্ট্রার বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আপনার যা খুশি তা লেখেন। ইতিপূর্বেও অনেকে লিখেছে, কিছুই হয়নি। এখন চাকরির শেষ সময়, কিছুই হবে না।’
জোর করে জায়গার মালিককে রেজিস্ট্রি অফিসে ধরে এনে রেজিস্ট্রি করানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে ফেনী সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। এমন অনিয়মে সাবরেজিস্ট্রার বোরহান উদ্দিন ৩-৫ লাখ টাকা ঘুষ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফেনী দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব দলিল লেখক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন, তারা সাবরেজিস্ট্রারের সঙ্গে চুক্তি করে তা সম্পন্ন করে।’ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা অতীত থেকে চলে আসছে।’
সাবরেজিস্ট্রার বোরহান উদ্দিন সরকার দুর্নীতির টাকায় অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, বোরহান উদ্দিন সরকারের স্ত্রী নাসরিন হকের নামে রাজধানী ঢাকার শ্যামলী স্কয়ারের বিপরীতে শ্যামলীবাগের ৩ নম্বর রোডে ‘লায়লা বাছেত ক্যাসল’ নামে একটি বাড়িতে রয়েছে আটটি ফ্ল্যাট। বাড়িটির নম্বর ২৭/ক। ওই বাড়িতে নাসরিন হকের নামে থাকা ফ্ল্যাটগুলোর নম্বর হলো ১/এ, ২/এ, বি, সি, ৩/এ, বি, সি, ৪/বি।
চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বেপরোয়া ছিলেন বোরহান উদ্দিন সরকার। ২০১৮ সালে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে থাকাকালে সপ্তাহে দুদিন মঙ্গল ও বুধবার দলিল সম্পাদনের কাজ করতেন। এরপর ২০১৯ সালে যান ময়মনসিংহের ভালুকায়। সেখানে তার কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন স্থানীয় দলিল লেখকরা। তারা বোরহানের প্রত্যাহার দাবিতে কলমবিরতি কর্মসূচিও পালন করেন। তার বিরুদ্ধে দলিল লেখকদের সঙ্গে অসদাচরণ, অতিরিক্ত টাকা আদায়, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সময়মতো অফিসে না আসা, নিবন্ধনের অপেক্ষায় থাকা দলিল রেখে সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করা এবং মনমতো ছুটি কাটানোসহ নানা অভিযোগ ছিল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার (নিবন্ধক) সালাহউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা সবসময় চেষ্টা করি শতভাগ সেবা প্রদান করতে।’ ফেনী সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো দলিল লেখক বা গ্রাহক আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
