প্রতিরক্ষা ইস্যুতে ইশিবার নেতৃত্বে জাপান ডানপন্থি হবে?

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৪, ১২:১৬ এএম

জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা গত মাসে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। কিশিদার উত্তরসূরি নির্বাচিত হয়েছেন ইশিবা শিগেরু। পাঁচবারের প্রচেষ্টার পর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ৬৭ বছর বয়সী ইশিবাকে জাপানের অনেকে স্কটল্যান্ডের অতীতের নেতা রবার্ট ব্রুসের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। ভোটের ফলাফল ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং গভীর কৃতজ্ঞতা বোধের চিহ্ন হিসেবে বারবার মাথা নত করে ফলাফল মেনে নেন। এরপর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ইশিবা বলেছেন, জাপানকে এ রকম এক রাষ্ট্রে পরিণত করে নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা তিনি করে যাবেন, সবাই যেখানে নিশ্চিত ও নিরাপদ পরিস্থিতিতে মুখে হাসি নিয়ে জীবনযাপন করতে পারবেন। তাকে প্রতিরক্ষা নীতি সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি কেবল জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই পালন করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের সদস্য থাকা অবস্থায় দেশের প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়াতে সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাপানের প্রতিরক্ষা খাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ যে নেবেন, সেটা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করে নিতেও একই রকম উৎসাহ ইশিবার মধ্যে সব সময় দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে ন্যাটোর অনুকরণে এশিয়া মহাদেশের জন্য নতুন একটি জোট গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছায়াতে অবস্থান নিয়ে ইশিবা সন্তুষ্ট। সেই অবস্থান ধরে রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর। ইশিবা জাপান-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা জোটের দৃঢ় সমর্থক। তবে জোটকে সমতাপূর্ণ অংশীদার করে তোলার প্রচেষ্টার কথাও তিনি জানিয়েছেন। প্রাথমিক এসব পদক্ষেপ শক্তিশালী জাপান গড়ে তুলতে কতটা সহায়ক হবে, তা অবশ্য আরও বেশি অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ, সমতাপূর্ণ জোট গড়ে তুলতে ইশিবার আকাক্সক্ষা, শুরুতেই সেটা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাধার মুখে পড়ছে। ওয়াশিংটন স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছে যে সামরিক বাহিনীর অবস্থান সংক্রান্ত চুক্তি বদল করে নেওয়ার কোনো আকাক্সক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। আর সেই চুক্তির সংশোধন ছাড়া সমতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে নেওয়ার আকাক্সক্ষা যে অধরাই থেকে যাবে। অন্যদিকে এশিয়ার ন্যাটো গড়ে তোলার যে আকাক্সক্ষা ইশিবা ব্যক্ত করেছেন, তা নিয়েও এখন সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুরুতেই এর বিরোধিতা করে বলেছেন, সে রকম কোনো জোটে যোগ দিতে নয়াদিল্লি আগ্রহী নয়।  একমাত্র ফিলিপাইন ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশও ন্যাটোর অনুকরণে আঞ্চলিক একটি জোট গঠনের ধারণার সঙ্গে একমত নয়। এর প্রধান কারণ অবশ্যই সাম্প্রতিক সময়ে আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চীনের গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অর্থনৈতিক দিক থেকে চীন এখন আর জাপানের চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই এবং অঞ্চল জুড়ে আছে চীনের বিশাল বিনিয়োগ। এর ফলে সেই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে এরা কেউ রাজি নয়। এশিয়ার ন্যাটো গড়ে তোলার ধারণার পেছনে যে চীনকে প্রতিহত করতে পারার আকাক্সক্ষা আছে, সেটা এখন আর অলীক কোনো ভাবনা নয়। ফলে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ মনে করছে, ন্যাটোর অনুরূপ জোটে যোগ দিলে দ্রুতই সেসব দেশ চীনের বিরাগভাজন হয়ে উঠবে। তাই ইশিবার এশিয়ার ন্যাটো গড়ে তোলার ভাবনা বাস্তবায়িত হলে শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যাবে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের বাইরে অন্য কোনো দেশ এতে যোগ দিচ্ছে না। জাপানও এই বাস্তবতা এখন আঁচ করতে পারছে। ফলে বুঝাই যাচ্ছে, প্রতিরক্ষা নীতিমালার দিক থেকে বড় রকমের হোঁচট খাওয়ার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করলেন জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী।

এমন এক সময় ইশিবা দলনেতার দায়িত্ব নিলেন, যখন বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে এলডিপি। বিভিন্ন কেলেঙ্কারির জের ধরে দলে বিভক্তি দেখা দিয়েছে, নজিরবিহীনভাবে কমেছে জনপ্রিয়তা। এমনই এক পরিস্থিতিতে গত মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। এরপর ভোটাভুটির মাধ্যমে ইশিবাকে নতুন নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু ইশিবার সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের দলীয় আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ। কেলেঙ্কারিতে সমালোচিত এলডিপির হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার বাইরে আরও আছে অর্থনৈতিক সমস্যার চক্র থেকে জাপানকে বের করে আনা এবং চীনের সঙ্গে তৈরি হওয়া জটিলতা থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারা। কিন্তু কতটা সফল তিনি হবেন, এর অনেকটাই নির্ভর করবে দলের ভেতরে নিজের সমর্থনের ভিত্তি শক্তিশালী করে নেওয়ার ওপর। ইশিবা এমন এক সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, যখন এ অঞ্চলে দিন দিন আগ্রাসী হয়ে উঠছে চীন। পশ্চিমা বলয়ের বিপরীতে অবস্থান করা রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে বেইজিং। এমনকি সম্প্রতি জাপানের দুটি দ্বীপের মধ্যে প্রবেশ করেছিল চীনের যুদ্ধজাহাজ। এমন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত হুমকিগুলো নিয়ে তৎপর থাকতে হবে ইশিবাকে। একই সঙ্গে চীন সংক্রান্ত মন্তব্য করার সময় সতর্ক থাকতে হবে তাকে। কারণ, ইশিদা এলডিপির নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায় তার দেশ। কারণ, চীন ও জাপানের সম্পর্কের গভীর, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল উন্নয়ন হলে তা দুই দেশের মানুষের মৌলিক স্বার্থগুলো রক্ষা করবে।

নিজ দেশে ইশিবাকে অর্থনীতিতে সুবাতাস ফেরাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের কারণে জাপানের মুদ্রা ইয়েনের দাম পড়ে গেছে। যদিও ইশিবা দলনেতা নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হয়েছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে এখন ১৪২ দশমিক ৯৪ ইয়েন পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে ১ ডলারে ১৪৬ দশমিক ৪৯ ইয়েন পাওয়া যাচ্ছিল। এ ছাড়া জাপানের গ্রামীণ অঞ্চলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইশিবা। দেশটির দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি সরকারি সংস্থা গড়ে তোলার কথাও বলেছেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া ইশিবার ওপর ভরসা রাখছেন অনেকে। কারণ, তিনি যা মনে করেন, তা করে দেখানোর সাহস রয়েছে তার। ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিকো নাকাবায়াশি বিবিসিকে বলেন, ‘মানুষ মূল্যস্ফীতি নিয়ে হতাশ। জাপানি মুদ্রার মান কমে গেছে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে অনেক আমদানিপণ্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।’ আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জাপানের বার্ধক্য ও ক্রমেই কমতে থাকা জনসংখ্যা, যা সামাজিক ও চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ তৈরি করছে। এটি দেশের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মশক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাপান কীভাবে তার শ্রমবাজার পরিচালনা করবে এবং অভিবাসন নিয়ে মনোভাব বদলানো উচিত কি না, তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে সরকারকে। ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ জাপানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই এলডিপির জন্য এসব চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে সাধারণ নির্বাচনকে এগিয়ে আনার দাবিও রয়েছে। কিন্তু এখন দেখার বিষয় হচ্ছে নতুন প্রধানমন্ত্রী ইশিবা জাপানকে কোনদিকে নিয়ে যান। তবে প্রতিরক্ষার বিষয়ে ইশিবার নেতৃত্বে জাপান আরও ডানপন্থি হয়ে উঠুক, এটা অনেকেই চান না।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত