হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে আইনজীবীর সঙ্গে বিচারপতির কথোপকথন নিয়ে আদালত কক্ষে হট্টগোল হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ২৬ আইনজীবী। পরে প্রধান বিচারপতি দ্বৈত বেঞ্চটি পুনর্গঠন করে দেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী জানান, বেলা ১১টার দিকে আগাম জামিন আবেদন মেনশনের সময় আইনজীবী আশরাফ রহমান কার্যতালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তা আদালতের নজরে আনেন। বেঞ্চ কর্মকর্তারা অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তালিকা করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আইনজীবী আশরাফ রহমানের উদ্দেশে বলেন, ‘চেনো আমাকে, এক থাপ্পড় দেব।’ তখন ওই আইনজীবীসহ উপস্থিত বেশ কয়েকজন আইনজীবী বিচারপতির কথা নিয়ে আপত্তি জানান। এ নিয়ে হট্টগোল শুরু হয়। তা চলে প্রায় আধা ঘণ্টা। পরে বিচারপতিরা এজলাস ছেড়ে চলে যান।
এ ঘটনায় প্রধান বিচারপতি বরাবর ২৬ আইনজীবীর দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগের ৭ নম্বর বেঞ্চে (মূল ভবন) অবকাশকালীন এখতিয়ারাধীন শুরু থেকেই মামলার কার্যতালিকা তৈরি ও শুনানিতে ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। এ বিষয়গুলো নিরসনের জন্য আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদালতকে অবহিত করার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আজ (গতকাল) সকালে মেনশনের সময় আইনজীবীদের পক্ষে ব্যারিস্টার আশরাফ রহমান বিষয়টি আদালতের দৃষ্টিতে আনেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আপনার আদালতের বেঞ্চ অফিসাররা অনিয়ম করে সব জমা করা মামলা ঠিকমতো দৈনিক কার্যতালিকায় দেননি। এতে অসংখ্য আইনজীবী বঞ্চিত হয়েছেন।’
জবাবে বিচারপতি আতাউর রহমান খান ক্ষিপ্ত হয়ে হাত উঁচিয়ে ওই আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি বারের (আইনজীবী সমিতি) নেতা ছিলাম। তোমাকে কে সাহস দিয়েছে আমার আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলতে? এজলাস থেকে বের হও, বেয়াদব, তোকে থাপ্পড় দিয়ে পুলিশে দেব।’ এ সময় আদালতে অবস্থানরত আইনজীবীরা বিষয়টির তীব্র প্রতিবাদ করলে বিচারপতি আতাউর রহমান খান এজলাস ত্যাগ করেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইনজীবী ও আদালতের আচরণ অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক। জ্যেষ্ঠ বিচারপতির আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে উপস্থিত অধিকাংশ আইনজীবী সমস্বরে প্রতিবাদ জানান। এ সময় আদালত কক্ষে হইচই ও হট্টগোল হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে বিচারপতিরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এজলাস ত্যাগ করেন। এরপর আর আদালত বসেনি।’
এ বিষয়ে আইনজীবী আশরাফ রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) আগাম জামিন আবেদন মেনশন করে জমা দেন আইনজীবীরা। জমা দেওয়া কিছু সুনির্দিষ্ট মামলা আজকে (গতকাল) কার্যতালিকায় এসেছে, সবগুলো আসেনি। এতে আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অভিযোগ আছে, যারা টাকা দিয়েছে, তাদের মামলাগুলো কার্যতালিকায় এসেছে। যখন বেঞ্চ কর্মকর্তাদের এ অনিয়মের কথা প্রকাশ্যে আদালতে বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, তখন বিচারপতি ব্যক্তিগতভাবে বাজে ব্যবহার, অসৌজন্যমূলক ও অপ্রীতিকর আচরণ করেন। তিনি শারীরিকভাবে আমাকে আঘাত করার হুমিক দেন।’
বেঞ্চ পুনর্গঠন : হট্টগোলের এ ঘটনা নিয়ে আইনজীবীদের অভিযোগের পর হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ পুনর্গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ থেকে বিচারপতি আতাউর রহমান খানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার স্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলম। এ ছাড়া বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কাজী জিনাত হক।
