অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে নিত্যপণ্য মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এ ছাড়া উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ কমে যাওয়া, উচ্চ পরিবহন খরচ এবং বাজারের আধিপত্য ও সীমিত দর কষাকষির ক্ষমতার কারণেও এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণে গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা জানান।
ডিসিসিআই সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা পরিচালনা করে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণের মূল্যের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণের লক্ষ্যে পণ্যের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। গত ২০ থেকে ২৯ আগস্ট দেশের আটি বিভাগের ৪৯টি জেলায় এ গবেষণা পরিচালিত হয়, যেখানে ৬০০ জনের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছেন। গবেষণায় ২১টি খাদ্যপণ্যের ওপর তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ১২টি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, পাঁচটি আমদানি কার এবং বাকি চারটি স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানি করা হয়। এটি একটি বেসলাইন সমীক্ষা হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে উৎপাদক, আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সেমিনারে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. সায়েরা ইউনুস বলেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে পণ্যের মূল্য কমানো সম্ভব নয়, এজন্য সরকারকে প্রান্তিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৯ বার পলিসি রেট পরিবর্তন করলেও বাজারে এর প্রভাব তেমন উল্লেখজনক নয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে আমদানির বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি, কারণ কোভিড-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে আমাদের স্থানীয় পণ্য উৎপাদন ও
সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্রেড সাপোর্ট মেজারস উইংয়ের যুগ্ম সচিব ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, আমাদের বার্ষিক পণ্যভিত্তিক কোনো ‘প্রডাক্ট ক্যালেন্ডার’ নেই, তবে পরিসংখ্যানভিত্তিক থাকলে সরকারের পক্ষে পণ্য আমদানি শুল্কায়নসহ অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সহজতর হতো। প্রতি বছর আমাদের আবাদি জমি ১ শতাংশ হারে কমছে, ফলে কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ক্রমাগত হারে কমে যাচ্ছে এবং এর কারণে আমদানি-নির্ভরতা বাড়ছে। বতর্মানে কৃষি খাতে আমাদের ভর্তুকি ৪-৫ শতাংশ, যেটিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলে, স্থানীয় উৎপাদনশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া তিনি ক্রস বর্ডার বাণিজ্য প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা, আমদানি খরচ হ্রাস, বন্ডেড ওয়্যার হাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা বাড়ানো প্রভৃতির ওপর গুরুত্ব দেন।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়লেও উৎপাদকরা ন্যায্য দাম পান না। কখনো কখনো, দাম বাড়ানোর জন্য পরোক্ষ খরচ জড়িত হয়। আমরা যদি স্টোরেজ, পরিবহন এবং পণ্য প্রক্রিয়াকরণ পর্যায়ে উৎপাদন খরচ কমাতে পারি, তাহলে দাম তুলনামূলকভাবে কমে আসবে। শুধু প্রক্রিয়াকরণ এই বিশাল ক্ষতিরোধের জন্য একটি ভালো সমাধান হতে পারে।
এ ছাড়া তিনি একটি নিখুঁত নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য যথাযথ সরবরাহ এবং চাহিদাভিত্তিক তথ্যপ্রাপ্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়নের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে একটি ট্যারিফ ক্যালেন্ডার প্রণয়নের প্রস্তাবনা পেশ করেন। এর মাধ্যমে দেশীয় মৌসুম ছাড়াও পূর্বঘোষিত সময়সীমা অনুসারে আমদানি শুল্ক হ্রাস অথবা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সমন্বিত প্রচেষ্টার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সামগ্রিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষি পণ্য উৎপাদনের চিহ্নিতকরণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ঢাকা চেম্বারের নির্বাহী সচিব (গবেষণা) এ কে এম আসাদুজ্জান পাটোয়ারী ওই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কম সরবরাহ, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা, উচ্চ পরিবহন খরচ এবং বাজারের আধিপত্য, সীমিত দর কষাকষির ক্ষমতা এই গবেষণায় ওঠে এসেছে।
কৃত্রিম সংকট, এলসি খোলার সমস্যা, মৌসুমি পণ্যমূল্যের তারতম্য, টাকার অবমূল্যায়ন, সরবরাহ চেইনের অদক্ষতা, অপর্যাপ্ত স্টোরেজ সুবিধা এবং উৎপাদকদের সীমিত বাজারে প্রবেশাধিকার প্রভৃতি বিষয়গুলো পণ্যের মূল্য ওঠানামার জন্য দায়ী। বর্তমান খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হলো প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।
তিনি বলেন, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থা এবং তথ্যের অসামঞ্জস্যতা, স্থানীয় উৎপাদন হ্রাস এবং উচ্চ পরিবহন খরচ, কীটনাশকসহ সার-বীজ-তেল
এবং ওষুধের উচ্চমূল্য এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক গবেষণা পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে, যেন সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে
সক্ষম হয়। খাদ্যপণ্য সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও ভালো পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, পণ্যের অপচয় রোধে আরও স্টোরেজ সুবিধা সম্প্রসারিত করার ওপর জোরারোপ করা হয়।
