রাজবাড়ীর চার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটিতেও নেই জলাতঙ্ক রোগের টিকা। ফলে বাধ্য হয়েই সব উপজেলা থেকে টিকা নিতে ছুটতে হয় রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে। সেখানেও নেই পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ। ফলে বাইরের ফার্মেসি থেকে বেশি দামে কিনে নিতে হয় টিকাগুলো। এতে করে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জেলার সিভিল সার্জন জানান, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আর টিকা মিলছে না।
রাজবাড়ীর পাংশা, গোয়ালন্দ, কালুখালী ও বালিয়াকান্দি উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে জলাতঙ্ক রোগের টিকা প্রদানের কার্যক্রম। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মানুষ টিকা নিতে এলে তাদের রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রোগীরা সেখানে গিয়েই টিকা নিয়ে আসেন।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জলাতঙ্ক রেবিস ভাইরাসজনিত একটি সংক্রামক রোগ। এই ভাইরাসে সংক্রমিত কুকুর এই রোগটির প্রধান বাহক। এছাড়া বিড়াল, বেজি, শিয়াল, বানরের মাধ্যমেও এই রোগটি ছড়াতে পারে। তবে এসব প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে (অ্যান্টি রেবিস) টিকা দেওয়া হলে জলাতঙ্ক রোগ হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ কুকুরসহ অন্য প্রাণীর কামড়ে আহত হচ্ছে। এর মধ্যে কুকুর ও বিড়ালের দ্বারা মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সাধারণত জলাতঙ্ক বহনকারী কোনো প্রাণী যদি কোনো ব্যক্তিকে কামড় দিয়ে থাকে তাহলে সেই ব্যক্তির টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া এসব প্রাণীর কামড়ের অথবা আঁচড়ের ফলে যদি রক্ত বের হয় তাহলেও টিকা নিতে হবে। তবে কোনো ব্যক্তিকে বিড়াল, কুকুর অথবা অন্য কোনো প্রাণী যদি আঁচড় দেয় এবং তার শরীর থেকে কোনো রক্ত না বের হয় তাহলে টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অনেকে না বুঝে আতঙ্কিত হয়ে টিকা নিতে আসেন।
গোয়ালন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা সুমি আক্তার বলেন, ‘আমার পাঁচ বছরের মেয়েকে সম্প্রতি কুকুরে কামড় দিয়েছিল। গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে টিকা পাইনি। পরের দিন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে বাচ্চাকে টিকা দিয়ে এসেছি। আরও দুদিন এই টিকা দিতে হবে।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলার চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা আবজাল শেখ বলেন, ‘আমাকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুকুরে কামড় দেয়। এরপর আমি রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যাই। তারা আবার পরের দিন যেতে বলেন। পরের দিন গিয়ে দেখি টিকা বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। পরে আমরা চারজন একসঙ্গে টিকা কিনে নিয়ে আসি। এত বড় একটি হাসপাতালে টিকা থাকে না, এটি দুঃখজনক।’
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আগে জেলার উপজেলাগুলোতে জলাতঙ্ক রোগের টিকা দেওয়া হতো। এখন সেগুলোতে টিকা সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে হাসপাতালে টিকার চাহিদা বেড়েছে। আমাদের প্রতি মাসে টিকার প্রয়োজন হয় এক হাজার অ্যাম্পল। কিন্তু আমরা পাই ৫০০ থেকে ৬০০ অ্যাম্পল। এ কারণে অনেককে বাইরে থেকে টিকা কিনে আনতে হয়।’
সিভিল সার্জন ইব্রাহিম টিটন বলেন, ‘একটি অ্যাম্পুল ভাঙলে চারজনকে দিতে হয়। উপজেলাগুলোতে একসঙ্গে চারজন মানুষ পাওয়া কষ্টকর। অনেক সময় টিকাগুলো ফেলে দিতে হয়। আগে টিকাগুলো একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আর টিকাগুলো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আপাতত সদর হাসপাতালের মাধ্যমে জেলার সবাইকে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে আবার যদি কোনো প্রকল্প চালু হয়, তাহলে উপজেলাগুলোতে টিকা সরবরাহ করা হবে।’
