দলীয় সরকারের পক্ষে রাষ্ট্র সংস্কার কেন সম্ভব নয়?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪, ১২:২০ এএম

বাংলাদেশের রাজনীতি নামে বহুদলীয় কিন্তু আসলে দ্বিদলীয়। দেশের মূল দলগুলো বাকশালী বা কমিউনিস্ট মডেলে তৈরি। বড় দলগুলোর কমিউনিস্ট পার্টির মতো নিজস্ব ক্যাডার এবং ছাত্র সংগঠন আছে, পেশাজীবী অঙ্গ-সংগঠন আছে। দলগুলোর অবাধ দলীয়করণ ঠেকানোর মতো শক্তিশালী সিভিল সমাজ দেশে নেই। শক্তিশালী সিভিল সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সদিচ্ছার প্রচণ্ড অভাব। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চর দখলের মতো দেশ দখল হয়ে যায়। দেশের বড় তিনটি দলই পরিবারতান্ত্রিক। কোনো দলের নেতা নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের কোনো অনুশীলন নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো দলগুলো নীতিভিত্তিক নয়, নেতাভিত্তিক। আবার নীতি থাকলেও তা নেতার কাছে অনেক ছোট হয়ে থাকে। একই মতাদর্শের অনেকগুলো দল থাকে। ব্রাকেটে ব্যক্তির নাম দেখে এগুলো শনাক্ত করতে হয়। অধিকাংশ দল হচ্ছে ব্যক্তিসর্বস্ব, সাইনবোর্ড সর্বস্ব এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। এগুলো সংসদে একটিও আসন পায় না। তবুও টিকে থাকে। বড় দলগুলো টাকা দিয়ে এগুলো টিকিয়ে রাখে। দলগুলো আর্থিকভাবে সচ্ছলও না। আবার স্বচ্ছও না। দলের গঠনতন্ত্র অনেকটা ফ্যাসিবাদী ধাঁচের। নেতৃত্ব কুক্ষিগত থাকে কয়েকটি ব্যক্তির হাতে। দলীয় কর্মীরা আদার ব্যাপারি হিসেবে দলীয় অফিসে আসে। টিভি দেখে তাদের সময় কাটে। দলীয় নীতি সম্পর্কে তাদের কিছুই জানানো হয় না। শহীদ হওয়ার প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশে তাদের রাস্তায় নামানো হয়।

কোনো দলীয় সরকার দলীয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে পারবে না। কারণ ছাত্র ক্যাডার ছাড়া তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে পারবে না। ছাত্র সংগঠন এবং পেশাজীবী সংগঠন ব্যবহার না করে কোনো দল রাজপথে শোডাউন করতে পারবে না। চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির সুযোগ না দিলে কোনো ছাত্র আদর্শিক কারণে দলীয় ছাত্র রাজনীতি করবে না। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা না দিলে দলে কোনো কর্মী থাকবে না। দলীয় কর্মীদের জন্য কোনো ক্যারিয়ার পথ নেই। কর্মীদের নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে শহীদ হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। শহীদের লাশ নিয়ে মিছিল করলেও নেতাদের আসল ধান্দা থাকে রাজনীতি করে টাকা কামাই করা এবং বিদেশে টাকা পাচার করা। বড় দলগুলোতে সর্বোচ্চ নেতাকে ঐশ^রিক ভক্তি করা হয়। এ জন্য বড় দলগুলোতে সচেতন সমর্থকের চেয়ে অন্ধ সমর্থক বেশি। তারা নেতাদের উচ্চাভিলাষ পূরণে বলির পাঁঠা হিসেবে কাজ করে। বলির পাঁঠাদের মুখে বারবার শহীদ বললেও শহীদি মর্যাদা দিয়ে তাদের তালিকা প্রণয়ন করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ত্রিশ লাখ শহীদের কোনো তালিকা দেশের কোথাও সংরক্ষিত নেই। দুই লাখ বীরাঙ্গনার তালিকা নেই। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নির্ভুল কোনো তালিকা নেই। রাজাকারদের নির্ভুল কোনো তালিকা নেই। ফলে যাকে খুশি তাকে কায়দামতো রাজাকার বলে ঘায়েল করা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল কোনো তালিকা এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরও নির্ভুল কোনো তালিকা নেই। এ জন্য নেতাদের ডাকে রাজপথে জনগণ সহজে নামতে চায় না।

বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো ভাইস চ্যান্সেলর, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, প্রভোস্ট ইত্যাদি হওয়ার জন্য দলবাজি করেন। আইনজীবীরা জিপি, পিপি, অ্যাটর্নি এবং হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার জন্য দলবাজি করেন। পুলিশ ও আমলারা বড় বড় পদে যাওয়ার জন্য নেতার পদলেহন এবং দলবাজি করেন। এমনকি সেনা অফিসাররাও বিগত ১৫ বছরে দলবাজি থেকে মুক্ত ছিলেন না। আমলারা মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সচিব, সাংবিধানিক পদ এবং ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার জন্য দলবাজি করেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় কোটায় পদোন্নতি পাওয়ার জন্যই এত দলীয়করণ এবং দলবাজি। এ জন্যই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে জন্ম হয় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের। প্রায় সব পেশাজীবী নিচে নামতেও মানসিকভাবে প্রস্তুত।

দলীয় সরকারের হাত ধরেই স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে রাজনীতি ধীরে ধীরে দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে। ফলে স্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বর্তমান এই বিষবৃক্ষ। গ্যাং পলিটিক্সকে নলেজ পলিটিক্সে রূপান্তর মোটেই সহজ কোনো বিষয় নয়। সংসদীয় গণতন্ত্র এবং অধিকার ভিত্তিক রাজনীতির চর্চা বা অনুশীলন না থাকায় এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের কোনো স্বাদ পায় না। কোথাও কোনো দুর্নীতি বা সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটলে সবার নজর পড়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি ও তার নৈতিক চরিত্রের ওপর। তার লোভ ও নৈতিক ঘাটতির বিষয়ে নানারকম অভিমত প্রকাশ করে কথাবার্তা চলে। কিন্তু আইনের ঘাটতিটা সবার নজর এড়িয়ে যায়। বুদ্ধিজীবীদের ফোকাসটা এখানেই দরকার সবচেয়ে বেশি। এ দেশের মতো সুবিধাবাদী এবং ভীতু বুদ্ধিজীবী পৃথিবীতে বিরল।

এ দেশে প্রধানমন্ত্রীর পদটি মাফিয়া ডনের মতো। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে মাফিয়া ডনের মতো পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ-পদোন্নতি দেন। এই ক্ষমতা দিয়ে তিনি প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ এবং সাংবাদিকদের আজ্ঞাবহ ক্রীতদাস বানান। এদের মাধ্যমে তিনি ৫ বছরের ক্ষমতাকে বিনাভোটে টেনে লম্বা করে ১৫ বছর বানিয়েছেন। সাংবিধানিক ঈশ্বরের এ পদটি কোনো দলীয় প্রধানমন্ত্রী সংস্কার করবে বলে মনে হয় না। কোনো দলীয় প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের সত্তর অনুচ্ছেদ সংশোধন করে এমপিদের দ্বারা অপসারিত হতে চাইবেন না।

সংবিধানের ক্ষমতা কাঠামো থেকে বেশি ফায়দা লুটে রাজনৈতিক দল। শক্তিশালী সিভিল সমাজ না থাকায় জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জিম্মি। সংবিধান সংশোধনে বা রাষ্ট্র সংস্কারে সিভিল সমাজের মতামতকে কখনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে এ দেশে বিপ্লব বারবার বেহাত হয়ে যায়। এভাবেই ভারসাম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়। নির্বাচিত সরকারের কাছে সবসময় বিপন্ন নির্বাচন হয়েছে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এ দেশে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে নিরপেক্ষতা এবং সিভিল সমাজের তত্ত্বাবধায়ক শক্তি খর্ব করার জন্য হেন কোনো কাজ নেই যা করে না। জনগণের ম্যান্ডেট নেই বলে বারবার তারা সিভিল সমাজের রাষ্ট্র সংস্কারের সব উদ্যোগ ভ-ুল করে। জনগণ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে যায়। বেহাত হয় বিপ্লব। বদলায় না কিছুই ।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত