দেশে চলতি অক্টোবরের বাকি দিনগুলোতে ডেঙ্গু প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় ডেঙ্গু ছড়ানোর ব্যতিক্রমী ধরন লক্ষ করা যাচ্ছে। সে কারণে চলতি বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু থাকতে পারে এবং সেই প্রকোপ আগামী বছরের জানুয়ারিতেও একটা ধাক্কা দিতে পারে। এমনকি ব্যতিক্রম হিসেবে এ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে ডেঙ্গুর মাত্রা অন্য বছরের এ দুই মাসের তুলনায় বেশি হতে পারে। অবশ্য চলতি বছর রোগী বাড়লেও ডেঙ্গুতে জটিলতা কম। কারণ গত বছরের মতো এবারও মোট ডেঙ্গু রোগীর ৭০ শতাংশই ডেঙ্গু ডেন-২ ধরন দ্বারা আক্রান্ত।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ববিদ ও ভাইরোলজিস্ট এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের একজন কীটতত্ত্ববিদের সঙ্গে কথা বলে দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতির এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গুর এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রাদুর্ভাবের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অপরিচ্ছন্নতার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঢাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বা ব্রুটো ইনডেক্স ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অথচ এডিস মশা নিধনে কোনো কার্যক্রম নেই।
সর্বোচ্চ রেকর্ড ভাঙল : গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৯৮ জন, যা চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ রোগী। এর আগে পর্যন্ত বছরের সর্বোচ্চ রোগী ছিল ৬ অক্টোবর ১ হাজার ২২৫ জন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে আরও ছয়জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুতে বছরের নতুন রেকর্ড হয়েছে। গতকালের আগপর্যন্ত বছরের সর্বোচ্চ রোগী ছিল গত মাসে ১৮ হাজার ৯৭ ও মৃত্যু ৮০ জন। গতকাল সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৯৪২ ও মৃত্যু ৮৪। এ নিয়ে এ বছর মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৪৯ হাজার ৮৮০ আর মারা গেছে ২৪৭ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৬৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। আর সর্বনিম্ন সাতজন সিলেট বিভাগে। মৃতদের মধ্যে চারজন ঢাকা উত্তর সিটিতে এবং একজন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি ও চটগ্রাম বিভাগে ভর্তি ছিল।
ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে ডেঙ্গু : এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃষ্টি হচ্ছে, গরমও পড়ছে। এ অবস্থা এডিস মশার ডিম ফোটার জন্য খুবই উপযোগী। যেদিন বৃষ্টি একেবারেই বন্ধ হবে, সেদিন থেকে দেড়-দুই মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু প্রকোপ থাকবে। কারণ এ সময় এডিস মশা যে ডিম পাড়বে প্রথমে সেগুলো ফুটবে, লার্ভা হবে, পরে পূর্ণবয়স্ক হবে। ভাইরাসবাহী এডিস মশা কামড়ানোর পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে সুস্থ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু দেখা দেবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় দেড় থেকে দুই মাস লাগবে। বৃষ্টি না হলে ও তাপমাত্রা ঠান্ডা হলে ডেঙ্গু ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। তবে বছর জুড়ে অল্পবিস্তর থাকবে বলে জানান এ বিশেষজ্ঞ।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, চলতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে। তবে অন্য বছরের এ দুই মাসের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর মাত্রা বেশি হতে পারে।
এ কীটতত্ত্ববিদ বলেন, কোনো এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয় ব্রুটো ইনডেক্সের মাধ্যমে। এই ইনডেক্স ২০-এর বেশি হলেই তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। ঢাকার বেশিরভাগ জায়গায় ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর ওপর। এডিস মশার এ ঘনত্ব ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য উপযুক্ত মাত্রা। এটাতেই প্রমাণ করে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ। আরেকটা উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, দুই-তিন সপ্তাহ ধরে এডিসের লার্ভার একই রকম ঘনত্ব মিলছে। তাতে বোঝা যায় এখন যে পরিমাণ ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে, সেই পরিস্থিতিটা অক্টোবর জুড়েই থাকবে।
৭০ শতাংশ রোগী ডেন-২ : আইইডিসিআরের ভাইরোলজিস্ট ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, এবার ঢাকায় মোট ডেঙ্গু রোগীর ৭০ শতাংশ ডেন-২ ধরনে আক্রান্ত। বাকি ধরনও আছে। ডেন-২ বেশি হওয়ায় ভীতিকর কিছু না। গত বছরও ডেন-২ বেশি ছিল। পরপর একই ধরনের ডেঙ্গু দেখা দিলে জটিলতা কম হবে। কিন্তু অন্য ধরনে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা আছে।
ডেঙ্গুর চারটি ধরনের কথা উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, একটিতে আক্রান্ত হলে পরবর্তীকালে ওই ধরনে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তেমন থাকে না। সাধারণত একটি ধরনের প্রাধান্য থাকে তিন-চার বছর। এ সময় বড় একটি সংখ্যক মানুষ এ ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের মধ্যে ওই ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। গত বছরও ডেন-২-এর প্রাধান্য দেখা গেছে। এবারও ডেন-২ বেশি। কাজেই এ ধরনে খুব বেশি জটিলতা হবে না।
