অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসলেও দিন যতই যাচ্ছে, ততই কথা উঠছে যে ক্ষমতাসীন সরকারটি স্বভাব-চরিত্রে বিপ্লবী নয়। কিন্তু, তাই বলে আবার আপসকামীও নয়। ‘অন্তর্বর্তী’ নামে চলা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে যে যেখান দিয়ে পারছে ঝাণ্ডা উড়িয়ে দিচ্ছে। তা আবার লাল-নীল-কালো কোনোটাই নয়। রঙ-বর্ণহীনও নয়। তাদের গাঁথুনি নানান জায়গায়। হরেক বায়না ও দাবিনামায় রাস্তায় নেমে যে যা পারছে করছে। অ্যাকশন কড়া হলে লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে দ্রুত। তবে, সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রাখার কাজে শতভাগ সফল তারা। সরকারের ভেতর-বাইরে আস্ফালনও কম নয়। সব মিলিয়ে নানান জায়গায় আজব এক কাণ্ডকারখানা চলছে।
এখন হতে চাইলেও সরকারের বিপ্লবী হওয়ার দিন-সময় ফুরিয়ে আসছে। এরপরও বিপ্লবী, মধ্যবর্তী, অন্তর্বর্তী, সুশীল যে নামেই হোক মানুষ চায় যথাযথ অ্যাকশন। স্বভাব ঠিক করার মোক্ষম সময় চলে গেছে প্রায় আড়াই মাস। ১৫ বছর ৭ মাসের তুলনায় আড়াই মাস তেমন সময়ই নয়। আবার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একেবারে কমও নয়। মানুষ জানে সরকারটি সাময়িক মেয়াদের। কিন্তু, এ সরকারের কাছে মানুষের মাত্রাগতভাবে প্রত্যাশা বেশি। বিপ্লবী বা গতিময় না হলে এমন সরকারের পক্ষে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা কম। জোয়ার-ভাটার এ দেশে আস্থা বেশি দিন টিকিয়ে রাখাও কঠিন। এখন সে রকম একটি সন্ধিক্ষণেই সরকার। সরকারের গো-স্লোতে আস্থা-অনাস্থার দোলাচল ব্যাপক। ক্রমেই তা তীব্র হয়ে উঠছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং বর্তমানে ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ শুনিয়েছেন কঠিন কথা। বলেছেন, ‘এই সরকার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসেনি। এটা একটা বিপ্লবী সরকার। ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা কথা না শুনলে, আইনে থাকুক, আর না-ই থাকুক, তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’
প্রশ্ন হচ্ছে এই উপলব্ধি এত পরে কেন? দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সেই হোমওয়ার্ক ও সিদ্ধান্ত কি জরুরি ছিল না? এখন চাইলেই বিপ্লবী বা খুব কঠোর হওয়া কি সময়ের অনুমোদন পাবে? নাকি আছে মাঠের সেই বাস্তবতা? গেম হাতছাড়া না হলেও, হাত থেকে তেজোদ্দীপ্ত সময়টা কিন্তু চলে গেছে। কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘না প্রেমিক, না বিপ্লবী’ কবিতাটি এ প্রাসঙ্গিকতায় খুবই স্মরণযোগ্য। ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে বেশ জনপ্রিয় কবিতাটি লেখা হয়েছিল তখনকার রাজনৈতিক পটভূমিতে। না গণতান্ত্রিক, না বিপ্লবী গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা এ সরকার কম-বেশি অনেক কিছুতে হাত দিচ্ছে। কিন্তু, সেভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এরই মধ্যে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সিদ্ধান্তে ও শুরুতে কিছুটা বিপ্লবী ধাঁচ থাকলেও বাস্তবায়নে সুশীল ভাবের কারণে নিত্যপণ্যের বাজার অনিয়ন্ত্রিত। শেয়ার বাজার তছনছ। বঙ্গবাজারও ভাঙা হাটের মতো। আরব বসন্ত বানচালের নমুনা চারদিকে। নাবালক, সাবালক, মতলববাজ, উগ্রবাজ, প্রতিশোধবাজ, সুবিধাবাজদের তৎপরতা স্পষ্ট। এই চরিত্রের চক্র আগে করেছে ফ্রিস্টাইলে। এখন করছে পেয়ে বসার ব্যবসা। তা দুরবিন দিয়ে দেখার বিষয় নয়। খোলা চোখেই খোলাসা। গত দুই-আড়াই মাসে ব্যাংকে আমানত কমেছে ১১০০০ কোটি টাকার বেশি। তা অনেকটা স্বাভাবিক। কারণ ব্যাংকগুলোর সিংহভাগ জনসাধারণের আস্থা হারিয়েছে। জনগণ এখানে আমানত রাখতে ভয় পাচ্ছে। কেন? সোজা জবাব আস্থাহীনতার কারণে। তা ব্যাংক, বীমা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাজার, রাস্তাঘাট সবখানে সব সেক্টরেই।
খারাপ, দুর্বল বা প্রবলেম ব্যাংকগুলো আমানত আকৃষ্ট করার জ্েয এখন ১১-১২% পর্যন্ত সুদ ঘোষণা করছে। কিন্তু মানুষ ভরসা করতে পারছে না। কারণ সেখানে আমানত রাখলে আম-ছালা অর্থাৎ আমানত-সুদ উভয়ই হারানোর ভয়। অন্যদিকে, ভালো ব্যাংকগুলো কোনোভাবেই ৬-৭% এর বেশি সুদ অফার করে না। আবার এই হারে আমানত রাখলে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আসল রোজগারেই ঘাটতি পড়বে। বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ আর সরকারি কর তো কাটবেই। এর বিকল্প হতে পারত শেয়ার বাজার ভাইব্রেন্ট করা। তাতে খেলাপি ঋণের সম্ভাবনা কমে ব্যাংকের ওপর চাপ কমত। সেই লক্ষণ এখন পর্যন্ত নেই। অথচ ৫ আগস্টের পর ৬, ৭, ৮ তারিখে শেয়ার বাজারে বুলিশ অবস্থা আসে পরিবর্তন সৃষ্টিকারী ছাত্র-জনতার প্রতি আস্থা থাকার কারণেই। প্রত্যাশা ছিল পাঁচ আগস্ট পরবর্তী পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। বাজারের গভীরতা বাড়বে। বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হবে। কিন্তু ‘সকলি গরল ভেল’। এর ফের সংশ্লিষ্টদের জানা। গ্যাস-বিদ্যুৎ, সড়ক, নিত্যপণ্যের বাজারসহ প্রায় সবখানেই চাদরের নিচে এখনো টোকা দিচ্ছে লুটেরা বা তাদের দোসররা। এর সর্বশেষ উদাহরণ ‘বিদ্যুৎ লীগ’ কর্মীদের দাবিজনিত অস্থিরতার নতুন দুয়ার।
বেগতিক অবস্থা বুঝতে পেরে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মীরা কাজে না ফিরলে বিকল্প জনবল নিয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। জানান, দেশের জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। এক্ষেত্রে বিগত সরকারের কোনো পথ অনুসরণ করা হবে না। স্বচ্ছতা ও জনগণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই এসব বাস্তবায়ন করার কথা জানান উপদেষ্টা। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় বৃহস্পতিবার চাকরিচ্যুত করা হয় পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ২৪ জনকে, আটক করা হয় বেশ কয়েকজনকে। চাকরিচ্যুতদের চাকরি পুনর্বহাল ও আটককৃতদের মুক্তির দাবিতে সেদিনই কমপ্লিট শাটডাউন বা বিদ্যুৎ বন্ধের ঘোষণা দেয় তারা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার আগেই বিভিন্ন জায়গায় ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখে তারা। এমন বাস্তবতায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহক। উপদেষ্টা জানান, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিসহ কারও কোনোরকম নাশকতা সহ্য করবে না সরকার। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সরকার দুর্বল নয়, বরং জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়েই এসেছে।
এই জনসমর্থনের প্রতিদানই তো চাচ্ছে জনগণ। প্রশ্ন ছোড়া হচ্ছে, জনআস্থার ওপর ভর করে বাজারে অ্যাকশনে যাচ্ছে না কেন সরকার? তবে, চেষ্টা আছে। এই চেষ্টার অংশই ডিম ও তেল আমদানিকারকদের ২০ ও ৫ শতাংশ হারে কর ছাড়। কিন্তু, কোনো আমদানিকারক বা সিন্ডিকেট সদস্যকে শাস্তি দেওয়ার তথ্য নেই। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদেরও একই প্রশ্ন। ২৮টি কোম্পানিকে জেড ক্যাটাগরিতে পাঠানো হয়েছে। জেড ক্যাটাগরির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিএসইসি ও কোম্পানির পরিচালককে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।
অবশ্য, এসবের মধ্যে সুসংবাদ যোগ করেছেন অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ডক্টর সালেহ উদ্দিন আহমেদ। জানিয়েছেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সর্বাত্মক চেষ্টায় কাজ শুরু করেছে সরকার। সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ডিমের মতো অন্য নিত্যপণ্যেরও দাম কমবে। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় গত সপ্তাহ থেকে প্রতিদিনই রির্জাভের পরিমাণ বাড়ছে। মাঝেমধ্যে এ ধরনের খবরে আস্থার বারতা জোগায়। আবার বিপরীত খবরচিত্র দেয় আঘাত। যেমনটি ঘটেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করে আবারও ফল তৈরি ও প্রকাশের দাবি জানিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকে রবিবার তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে ফেল করা কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী। তারাই আবার ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং বিক্ষোভ করে। ঘোষিত ফলাফলকে বৈষম্যমূলক দাবি করে ‘এইচএসসি ব্যাচ ২০২৪’-এর ব্যানারে একদল শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উদ্দেশে রওনা দেয়। বেলা ১টার দিকে মিছিলটি বোর্ডের ফটকের সামনে পৌঁছায়। তাদের মধ্যে কৃতকার্য শিক্ষার্থীরাও ছিল। একপর্যায়ে ফটকের তালা ভেঙে শিক্ষার্থীরা বোর্ডের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কক্ষে ভাঙচুর করে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এখন তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। সম্ভব না হলে কী করা? শেষ পর্যন্ত গতকালের (সোমবার) দেশ রূপান্তর অনলাইনের খবর অনুযায়ী, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন অধ্যাপক তপন কুমার সরকার। সোমবার (২১ অক্টোবর) তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন।
অনাস্থা-অসংগতির নানা উপাদান প্রশাসনের হেডকোয়ার্টার সচিবালয়সহ সড়ক-মহাসড়ক এমনকি অলিগলির রাস্তাঘাটেও। গত মাস দুয়েকে কি কয়েক হাজার যানবাহন নেমেছে রাস্তায়? তাহলে কেন এই যানজট? ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে নিজেদের গাড়ি নিজেরাই পোড়ানোর কুশীলবদের কারও বিরুদ্ধে? ক্রীড়াঙ্গনে অরাজকতা কাটিয়ে স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগও হোঁচট খাচ্ছে। সাকিব দেশে আসবেন কি না সেটা মিরপুরে দাঁড়িয়ে পাল্টাপাল্টি আন্দোলনে নির্ধারণ হবে? তাহলে সরকারের কাজ কী? আস্থার অবশিষ্ট জায়গা খুঁজবে সরকারকে সমর্থন দেওয়া জনগণ? সংস্কার-মেরামত, জনমত-জনসমর্থন; নামে যা-ই হোক ক্ষমতার কুশীলবদের মন-মননে জুলাই অভ্যুত্থান না থাকলে গাছ থেকে ‘পরিবর্তন’ পেড়ে জুস খাইয়েও তা দেওয়া যায় না। যাবেও না। ঠিক যেমন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন দিলেই তার চক্ষুষ্মান হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত ইহলোকে নেই।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
