বত্রিশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বৈষম্যে শেষ হচ্ছে শিক্ষাজীবন

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৫৫ এএম

একত্রিশ পেরিয়ে বত্রিশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা স্তরের অন্যতম বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের তদারকি করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ পোহাতে হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে। সেই চাপ কমাতে ও অধিভুক্ত কলেজগুলোর মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চশিক্ষা মূলত এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশের প্রায় ৪০-৫০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ক্যাটাগরিতে রয়েছে স্নাতক (সম্মান) কোর্স, স্নাতক (পাস) কোর্স ও স্নাতকোত্তর।

দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্মে থেকেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নানামুখী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবহেলার জাঁতাকলে। দেশের বেশিরভাগই অর্থাৎ প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। অথচ যত সমস্যা এবং প্রতিবন্ধকতা, সবকিছুই যেন এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে আবর্তিত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আবর্তিত সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে সেশনজট। প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও সেশনজট সমস্যা নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এই সেশনজটের কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে আজ বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলোর মধ্যে আছে সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতি, কারিগরি শিক্ষায় অনগ্রসরতা এবং ক্লাস ও অবকাঠামোগত সমস্যা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের এই তামাশা যেন কোনোভাবেই থামছে না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীপিছু বার্ষিক ব্যয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমানে যা মাত্র ৭০২ টাকা। অর্থাৎ শিক্ষার্থীপিছু মাসে ৫৮ টাকা ব্যয় করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক এক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীপিছু ব্যয়সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। ইউজিসির প্রতিবেদনের তথ্য বলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০২০ সালে (এক বছর) একেকজন শিক্ষার্থীর জন্য গড়ে ব্যয় করেছে ১ হাজার ১৫১ টাকা, যা পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে কমিয়ে ৭৪৩ টাকা করা হয়। আর ২০২২ সালে গড়ে একেকজন শিক্ষার্থীর জন্য ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ৭০২ টাকা। অর্থাৎ যা মাসে ৫৮ টাকার সামান্য বেশি (৫৮.৫)।

দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে যতজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, তার মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশই পড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোয়। বাংলাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ আছে ২ হাজার ২৫৭টি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোয় পড়াশোনার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। ঠিকমতো ক্লাস না করে পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ইউজিসির তথ্যে উঠে আসে, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপিছু ব্যয় সব সময়ই বেশি। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনেক কিছু গবেষণাগারে কিংবা হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম থাকে। দেশের শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীপিছু ব্যয় বেশি করে, সেগুলোর পড়াশোনা ও গবেষণার মান তুলনামূলক ভালো হবে। আর যারা কম ব্যয় করে, তাদের শিক্ষার মান খারাপ হবে এমনটাই স্বাভাবিক।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বার্ষিক ৭০২ টাকা একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের বিনিয়োগ নিছক হাস্যকর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই শিক্ষায় বরাদ্দের হার সবচেয়ে কম, যা কখনোই কাম্য নয় এবং খুবই দুঃখজনক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার এমন বেহাল দশা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে দেশের শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাদ দিয়ে যৌক্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপিছু বরাদ্দ বাড়ান।

শুধু তাই নয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যবর্তী বিস্তর ফারাক। এই প্রতিবন্ধকতার দেয়াল পেরোতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। এমনকি এই প্রতিবন্ধকতার সমাধান খুঁজে না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। তারপরও এমন প্রতিবন্ধকতার অভিশপ্ত দেয়ালে আটকে আছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থী। প্রশ্ন হচ্ছে এই প্রতিবন্ধকতাজনিত কারণে আর কত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি এবং আর কত শিক্ষার্থীর অকালে জীবন গেলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের টনক নড়বে?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সর্ববৃহৎ সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ-সংক্রান্ত জটিলতা। এক কথায় যাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের অনিয়ম বা চূড়ান্ত গাফিলতিও বলা চলে। কেননা দেখা যায়, একজন পরীক্ষার্থী আটটি কোর্সের ছয়টি কোর্সে আশানুরূপের চেয়েও বেশি মার্কস পেয়ে যাচ্ছে। আর বাকি দুটি কোর্সে হয়তো ‘সি’ গ্রেড, নয়তো ‘সি’ প্লাস গ্রেড পাচ্ছে। কিংবা এমনও হয়ে থাকে, বাকি দুটো কোর্সেই ‘এফ’ গ্রেড আসছে। কিন্তু একজন পরীক্ষার্থী তার অকৃতকার্য কোর্সগুলো সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় একমাত্রই ঢাকার গাজীপুরে, যা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বাইরে অন্যান্য জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরীক্ষার্থীদের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়ে। তাই সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে এসে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করা কজনের ভাগ্যে আর জুটে? এই অকৃতকার্য কোর্স দুটির উত্তরপত্র অনলাইনে পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন করে কখনোই সঠিক প্রতিকার মেলেনি।

সর্বোপরি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপার সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন প্রাণ ফিরে পাবে। অতঃপর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি ও সুবিবেচনা কামনা করছি।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত