বাংলাদেশে গত দেড় মাস ধরে চলমান পরিকল্পিত শ্রমিক অসন্তোষে ভারতসহ কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ নিজেদের তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় সৃষ্ট এমন আন্দোলনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের আসন্ন দুটি মৌসুমের জরুরি ক্রয়াদেশগুলো ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে সরে গেছে বলে দাবি করছে বিজিএমইএ। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা পেয়েছে।
ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, বাংলাদেশের সংকটের সুযোগে সেপ্টেম্বরে ভারতের পোশাক রপ্তানি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। টেলিগ্রাফ তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ভারতীয় রপ্তানিকারকরা স্বল্প মেয়াদে ২০ থেকে ২৫ কোটি ডলারের মাসিক ক্রয়াদেশ পেয়েছে।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি অংশ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আয় আসা এ খাতটির ক্ষতি করতে উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ বিপুল পরিমাণের অর্থব্যয়ে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামায়। গত ৩০ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের পোশাক খাতে শ্রম অসন্তোষ চলে আসছে, যা গতকালও বিচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল। দেশের পোশাক খাতের অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে অন্য দেশগুলো। বিশেষ করে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে ক্রয়াদেশ সরে যাচ্ছে। যদিও এ পরিপ্রেক্ষিতে বিজিএমইএ দাবি করছে, ক্রয়াদেশ অন্য দেশে দেওয়া এসব ক্রেতাকে খুব শিগগিরই আবার ফেরানো সম্ভব হবে।
গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদ্য বিদায়ী সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাক খাতের শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণে প্রায় ৪০ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে চলে গেছে। তবে এক্ষেত্রে এসব ক্রেতাদের ফেরানো যাবে বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে স্প্রিং ও সামার সিজনের জরুরি ক্রয়াদেশ দিয়েছিলেন ক্রেতারা। যেহেতু তাদের পণ্যগুলো জরুরি প্রয়োজন ছিল, তাই তারা সাময়িক সময়ের জন্য অন্য দেশে গিয়েছে। তারা আবার ফিরে আসবেন।
ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানি সেপ্টেম্বরে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে টেলিগ্রাফ বলছে, বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে একটি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে ভারত এ সুযোগ নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বাঁধার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ভারতের পোশাক খাতে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। এটি অন্যান্য প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোকে প্রভাবিত করেছে।
অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের (এপেক) চেয়ারম্যান সুধীর সেখরি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও ভারতের আরএমজি রপ্তানি উচ্চ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘অনেক নেতৃস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মন্দার সম্মুখীন হয়েছে। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতায় উপকৃত হয়েছে।’
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের কারণে কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে ডেলিভারির সময়সূচিতে বিলম্ব হচ্ছে।
কেয়াররেটিংয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বা দুই প্রান্তিকের বেশি সময় ধরে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা সময়সীমা পূরণে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের এই সংকট ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্প মেয়াদে ২০-২৫ কোটি ডলারের মাসিক ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে স্থায়ীভাবে বাজারের দখল পেতে পরিচালন দক্ষতা এবং অন্যান্য সংযোগ শিল্পের সুবিধা নিতে প্রস্তুত। এই উন্নয়ন ভারতীয় পোশাক নির্মাতাদের বিশ্বব্যাপী উপস্থিতি প্রসারিত করার নতুন সুযোগ উন্মুক্ত করেছে। কারণ ব্র্যান্ডগুলো বিকল্প, আরও নির্ভরযোগ্য সোর্সিং বিকল্প খোঁজে।
ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই গতিকে পুঁজি করতে সেখরি ঘোষণা করেছেন, ভারত আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ করবে এবং পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট, ভারত টেক্স ২০২৫ আয়োজন করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং ভারতীয় সরবরাহকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য একটি দৃঢ় ইচ্ছা আছে।’
ভারতের বাণিজ্য সক্ষমতা এবং ঐতিহ্য প্রদর্শনের জন্য এপেক স্পেন এবং নিউ ইয়র্কে রোডশোর পরিকল্পনা করছে।
এপেক এর সেক্রেটারি জেনারেল মিথিলেশ্বর ঠাকুর বলেন, ভারতকে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি পছন্দের সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যেসব দেশে ভারতমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে। তিনি বলেন, এফটিএ অংশীদার দেশগুলো বাজার সম্প্রসারণ এবং ভারতের আরএমজি রপ্তানিতে আরও বৃদ্ধির পথ তৈরি করছে।
