ঋণ শোধের চাপে বাবা-মা হারানো তিন শিশু

  • বিদেশ যাওয়ার জন্য ২০১৯ সালে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বদরুল
  • ২০২০ সালে মারা যান তিনি, তার আগেই মৃত্যু হয় স্ত্রীর
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৪, ০৯:০৯ এএম

সেই টিনের ঘরটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ঘরবাড়ি জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো বদরুল আলম বরকত ও লুপা বেগম দম্পতির স্মৃতিচিহ্ন। ছোট্ট বাড়ির উঠোনের একপাশেই অন্ধকার কবরে চিরনিদ্রায় তারা। বাড়িতে আছে তাদের তিন নাবালক সন্তানও। চার বছর আগে বাবা-মাকে হারানোর পর স্বজনদের সহায়তায় খেয়ে না খেয়ে অনাদর-অবহেলায় বড় হচ্ছে মিম, জিম ও রকি। সম্প্রতি তাদের অসহায় জীবনে নেমে এসেছে আরেক বিভীষিকা। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক গোপালগঞ্জ শাখা থেকে তাদের বাবার করা দুই লাখ টাকার ঋণ শোধের চাপ এখন তাদের মাথায়। অথচ এই ঋণ বদরুল-লুপার মৃত্যুর পর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মওকুফ হয়েছে বলে জানতেন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক গোপালগঞ্জ শাখা থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে অভাবের সংসারে সুখের আলো জ্বালাতে ২০১৯ সালে বিদেশে পাড়ি জমান গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেষপুর ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামের বদরুল আলম বরকত। স্ত্রী ও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে অমানবিক পরিশ্রম করে প্রবাসে দিন পার করছিলেন বদরুল। ধারদেনার টাকা, ব্যাংক লোন পরিশোধ ও সংসারের শান্তির আশায় দিনরাত খাটতে থাকেন তিনি। এর মধ্যেই তিনি যাওয়ার কয়েক মাস পরেই প্রসবকালীন রক্তক্ষরণে মারা যান লুপা। ভূমিষ্ঠ হয় তাদের আরেক সন্তান রকি। এদিকে প্রিয়তমা স্ত্রীর অকালপ্রয়াণে সন্তানদের কথা চিন্তা করে বিদেশের মাটি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন বদরুল। কোলে তুলে নেন মা-হারা শিশু আবদুর রহমান রকিকে। সদ্য মা-হারা দুই মেয়ে মিম ও জিম বাবাকে কাছে পেয়ে মায়ের শোক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এখানেও বিধিবাম, দেশে ফেরার আট মাসের মাথায় স্ট্রোক হয় বদরুলের। তিনিও তিন সন্তানকে ছেড়ে হার মানেন মৃত্যুর কাছে। এরপর থেকে স্বজনদের সহায়তায় খেয়ে না খেয়ে অনাদর-অবহেলায় বড় হচ্ছে এতিম তিন সন্তান মিম, জিম ও আবদুর রহমান রকি।

এদিকে ব্যাংক লোন মওকুফের জন্য আত্মীয়স্বজনরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের গোপালগঞ্জ শাখায় আবেদন করেন। সে সময় তাদের জানানো হয়, কোনো গ্রাহক ও নমিনি যদি ২২ মাসের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে ওই গ্রাহকের লোন মওকুফ করা হয়। সেই নিয়মেই বদরুলের সন্তান, আত্মীয়স্বজনরা ভেবেই নিয়েছিল লোন মাফ হয়ে গেছে। কিন্তু মওকুফ আবেদনের তিন থেকে সাড়ে তিন বছর পর কিস্তির জন্য চাপ প্রয়োগ শুরু করে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মুকসুদপুর শাখা। ব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে, কাগজপত্র তারা পাননি। পেলে ঋণ মওকুফ হয়ে যেত।

বদরুলের মৃত্যুর পর সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেশী ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘কাগজপত্র সব জমা দেওয়া হয়েছিল। আমরা অনেকেই ব্যাংকে গিয়েছিলাম। সাংবাদিক সৈয়দ মিরাজুল ইসলামও আমাদের সঙ্গে ব্যাংকে গিয়েছিলেন। বদিউলের ঘরবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। ঘরবাড়ি বিক্রি করে লোনের টাকা পরিশোধ করলে এতিম বাচ্চাগুলো কোথায় যাবে?’

গোপালগঞ্জ জেলা প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মিরাজুল ইসলাম, বলেন, ‘বদরুল আলম বরকতের মৃত্যুর পর তা আমার কাছে আসে। তাদের নিয়ে আমি গোপালগঞ্জ প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকে যাই। তখন ব্যাংক থেকে আমাদের বলা হয়, কাগজপত্র দিয়ে যান, সেগুলো আমরা হেড অফিসে পাঠাব। হেড অফিস থেকে যে সিদ্ধান্ত হয়, সেটাই বাস্তবায়ন হবে। পরে জানতে পারি, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক বদরুলের মা ও এতিম বাচ্চাদের কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছে।’

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক মুকসুদপুর শাখা ব্যবস্থাপক মো. সেলিম বলেন, ‘তাদের আবেদনের কপি আমি ফাইলের কোথাও পাইনি। পেলে অবশ্যই মওকুফ করা যেত। এটা অনেক দিন আগের বিষয়, আবেদনের কপি থাকলে অবশ্যই বিষয়টা হতো। কেন হবে না এটা তাদের অধিকার। আমাদের কাছে যথাসময়ে আবেদনের কপি পৌঁছালে অবশ্যই তারা মওকুফ পেত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত