‘৪ বছর ধরে বাবা নাই, বাবা ডাকতে পারি না। এটা যে কত কষ্টের তা বলে বুঝাতে পারবো না। আমরা ছোট ছোট চার ভাই-বোন। ছোট দুই ভাইয়ের মধ্যে সবুজের বয়স ১০ আর শাওনের বয়স ৭ বছর। বাবার অনুপস্থিতিতে ওরা সংসারের হাল ধরেছে। ক্ষেতে কাজ করে ফসল ফলাই। আর সেই থেকে সংসার চলে আমাদের। আমাদের তো এই বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। বাবাকে হারিয়ে আজ আমরা ছিন্নমূল মানুষ হয়ে গেছি। আমার বাবাকে যদি মেরে ফেলা হয়ে থাকে তাহলে লাশ এনে দেন। বাবার কবরে বসে বাবা বাবা বলে ডাকতে তো পারবো।’
নিখোঁজ রমজান আলী গুডুর (৪০) সন্ধানের দাবিতে গ্রামবাসীর মানববন্ধনে আহাজারি করে এই কথাগুলো বলছিল জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালি ইউনিয়নের হাটমাগুরা এলাকার মেয়ে রুনা আক্তার (১৩)। তার আহাজারিতে ওই এলাকার বাতাস ভারী হয়ে আসছিল।
জানা যায়, গত ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর হাটমাগুরা গ্রামের আব্দুল মন্ডলের ছেলে মো. রমজান আলী গুডু সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে পরদিন বড় ভাই মো. শহীদুল ইসলাম মাদারগঞ্জ মডেল থানায় একটি সাধারন ডায়েরি করেন। পরে ২৭ অক্টোবর একই থানায় অজ্ঞাত কয়েক জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলটি জামালপুর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তাবস্থা মামলাটি পিবিআই তদন্ত শুরু করেন।
এ ঘটনায় মাদারগঞ্জ থানা পুলিশ ১ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে গোয়েন্দা পুলিশ আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। গ্রেপ্তারকৃতরা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পায়। জামিনে বের হয়ে তারা বাদীকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন বলে নিখোঁজ গুড়ুর পরিবার জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) গুডু নিখোঁজের ৪ বছর। তার সন্ধানের দাবিতে সকাল ১১ টার দিকে পরিবার ও গ্রামবাসীর আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে নিখোঁজ রমজান আলীর পরিবার ও গ্রামবাসীরা বক্তব্য দেন।
মামলার বাদী ও নিখোঁজ রমজান আলীর ভাই শহীদুল ইসলাম জানান, রমজান আলী গুডু নিখোঁজের তিন মাস পূর্বে তার স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় একই এলাকার মো. আবুল খানের ছেলে মো. বায়োজিদ (২৪)। মেয়ে নাবালিকা হওয়ায় বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হননি রমজান আলী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বায়োজিদ তার চাচা সেলিম খানসহ পরিবারের লোকজন রমজান আলীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে। এ কারণেই আমার ভাই রমজান আলীকে অপহরণ করে হত্যার পর তার লাশ গুম করেছে বলে তার ধারণা।
রমজান আলীর স্ত্রী সবুজা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীকে আমি ফেরত চাই। ছোট ছোট ৪ সন্তান নিয়ে আমি অনেক কষ্টে আছি। আমার দুই শিশু ছেলে ক্ষেতে খামারে কাজ করে। আর আমি মা হয়ে সেটা দেখছি।’
জামালপুর পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের পুলিশ সুপার এম এম সালাউদ্দীন বলেন, ‘মাদারগঞ্জের যমুনা নদী থেকে একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। সিআইডির মাধ্যমে লাশের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
