আওয়ামী লীগ কি আসলেই ত্রিপুরায় সমাবেশ করবে

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১২ এএম

রাষ্ট্রপতির অপসারণসহ পাঁচ দফা দাবিতে বিক্ষোভের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও আবদুল হান্নান মাসুদের বক্তব্যে আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সমন্বয়করা বলেছেন, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাকর্মীরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় এ সমাবেশ করবেন। 

অন্য একটি দেশের মাটিতে সমাবেশ করার বিষয়ে ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়কের যে দাবি, তা নাকচ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগকে সমাবেশ করার অনুমতি দেশটির সরকার দেবে কি না। আওয়ামী লীগের সমাবেশ বিষয়ে সমন্বয়কদের দেওয়া তথ্যের বিষয়ে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য আসেনি। ফলে আওয়ামী লীগ আসলেই কি আগরতলায় সমাবেশ করবে এ আলোচনা চলছে নানা মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

গত শনিবার সন্ধ্যায় নোয়াখালীতে এক অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ বলেছেন, ‘গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘ওই সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ নিতে পারেন। ওই সমাবেশ থেকে তারা (আওয়ামী লীগ) একটি প্রবাসী সরকারের ঘোষণা দিতে পারেন বলে তথ্য রয়েছে।’

একই দিন রাতে কুমিল্লায় ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, পালিয়ে গিয়েও খুনি হাসিনা দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন। কুমিল্লার কান্দিরপাড় এলাকায় আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদের গংদের স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, তাদের ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা কখনোই বাংলার মাটিতে সফল হবে না।’

সমন্বয়করা এমন একটি সময় এ ধরনের বক্তব্য দিলেন যখন ‘গণহত্যার’ অভিযোগে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হবে।

বিবিসি বাংলা এ বিষয়ে সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদের সঙ্গে কথা বলেছে। সংবাদমাধ্যমটিকে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের নিজস্ব কানেকশনের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি।’ সমাবেশ করার বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে আওয়ামী লীগ নেতারা ইতিমধ্যে তৎপরতা শুরু করেছেন বলেও দাবি করেন এই সমন্বয়ক। তিনি বলেছেন, ‘শনিবার তারা কুমিল্লার কাছে সীমান্তের এক জায়গায় মিটিংও করার চেষ্টা করেছিলেন, জানাজানি হওয়ার কারণে যা পরে আর সফল হয়নি।’

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দাবি অনুযায়ী কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর এবং ফেনী অঞ্চলের যেসব আওয়ামী নেতা এখনো দেশে অবস্থান করছেন, তারাই ওই বৈঠকটি করতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশ যেখানে স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশ এবং আওয়ামী লীগ কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ গোষ্ঠী নয়, সেখানে তারা কেন প্রবাসী সরকার ঘোষণা করতে যাবে? বিবিসি বাংলার এমন প্রশ্নে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাসুদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ, কিন্তু তারা নিজেরা তো এখান থেকে পদত্যাগ করে পালিয়েছে গণ-অভ্যুত্থান-গণবিপ্লবের মুখে জনরোষ থেকে বাঁচতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ রক্ত দিয়ে এখন যে সরকারকে বসিয়েছে, তারা সেই সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে চাচ্ছে। এ কারণেই তারা এমন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর তার ছেলে জানিয়েছেন, তার মা আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেননি। তার মা এখনো বৈধ প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে দাবি করেন।

নোয়াখালীতে এ বিষয়টি উল্লেখ করে সমন্বয়ক মাসুদ দাবি করেন, ‘এ রকম আলোচনা সামনে এনে এখন শেখ হাসিনা বিভিন্ন দেশে সফর করে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টার পরিকল্পনা করছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারকে জানানো হয়েছে বলে এই সমন্বয়ক জানান। তিনি গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা জানিয়েছি এবং এ ব্যাপারে সচেতন থাকার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছি।’ প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকেও বিষয়টি জানানোর কথা বলা হয়েছে বলে এই সমন্বয়ক জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে-পরে অনেক ধরনের আলোচনা হচ্ছে। আবার কিছু কিছু গুজব হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ গুজবের ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো ক্লু দেখা গেছে। সমন্বয়করা তাদের আশঙ্কার কথা স্পষ্ট করেছেন। আবার এর মধ্যে (মঙ্গলবার) রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবিসহ ৫ দফার আলটিমেটাম দিয়েছেন।’

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র ইস্যুতে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ঘিরে তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। একটি সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ও সমন্বয়করা রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে শপথভঙ্গের শামিল বলেছেন। এ নিয়ে গত সোমবার মধ্যরাত থেকেই সমন্বয়কদের আন্দোলন চলছে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবিতে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার দাবিও।

সমাবেশ বিষয়ে আওয়ামী লীগের বক্তব্য : ক্ষমতাচ্যুত দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগরতলায় সমাবেশের প্রস্তুতির বিষয়টি অসত্য ও ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় থাকার পথ বেছে নিয়েছে। আগরতলায় কিংবা বিদেশে কোনো প্রবাসী সরকার আওয়ামী লীগ করবে না। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের কোটি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। আমরা বাংলাদেশেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই রাজনীতি করব।’

নিষিদ্ধের দাবির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দেশপ্রেমিক দল। এই দলের সঙ্গে অবিচার করা হচ্ছে।’

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে, আগরতলায় এক জায়গায় নিয়মিত বৈঠক করেন পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তারা ঘরোয়া একটা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

প্রতিক্রিয়া জানাবে না ভারত : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির বাংলা বিভাগ ভারত সরকারের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, তারা এ ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেবে না। তারা নিশ্চিত করেছে, ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় এ ধরনের কোনো তৎপরতা গত কয়েক সপ্তাহে আদৌ তাদের চোখে পড়েনি।

ভারতে শেখ হাসিনার স্ট্যাটাস কী সেটা ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। ফলে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, এই মুহূর্তে ভারতের কোনো রাজ্যে প্রকাশ্যে কোনো সভা-সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়াটা সহজ হবে না। তবে আগরতলায় যেহেতু বেশিসংখ্যক নেতাকর্মী অবস্থান করছেন, তারা সাংগঠনিকভাবে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত