আপনার প্রতি একটি পরামর্শ যে, কখনো একসঙ্গে অনেক শ্যাম্পেন কেনা উচিত না যতক্ষণ না পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে উদযাপনটা আসলেই মূল্যবান। ২০১৬ সালের নভেম্বর, রাশিয়ার অতি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ ভøাদিমির জিহিরিনোভক্সি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের বিষয়ে এত নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি ১৩২ বোতল পানীয় নিয়ে রাশিয়ার পার্লামেন্ট ডুমায় টিভি ক্যামেরার সামনে (তার পার্টি অফিসে) জয় উদযাপন করেছিলেন।
উদযাপনকারীদের মধ্যে অবশ্য তিনি একাই ছিলেন না। নির্বাচনে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিতভাবে হোয়াইট হাউজ জয়ের পর মার্গারিতা সিমোনায়ান, রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল আরটির প্রধান সম্পাদক, টুইট করে আমেরিকার পতাকাসহ নিজ গাড়িতে পুরো মস্কো ড্রাইভ করার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন এবং আমি কখনোই ভুলব না যখন রাশিয়ার একজন কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছিলেন ট্রাম্পের জয় উদযাপন করার জন্য তিনি সিগার খেতে খেতে পুরো এক বোতল শ্যাম্পেইন শেষ করে দিয়েছিলেন।
তাদের প্রত্যাশা ছিল এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করবে। প্রত্যাশা ছিল যে ট্রাম্প রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ বাতিল করবেন; সম্ভবত, এমনকি ক্রিমিয়ান উপদ্বীপ, ইউক্রেনের সংযুক্ত ভূখণ্ডকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন।
রাশিয়ার সংবাদপত্র নেজাভিসিমায়া গেজেটার স্বত্বাধিকারী ও প্রধান সম্পাদক কনসটানটিন রেমচুকভ বলেন, ‘ট্রাম্পের গুরুত্বের জায়গা ছিল তিনি কখনো মানবাধিকার নিয়ে রাশিয়াকে সবক দেননি’। তবে ট্রাম্পের জয়ের এই উদ্দীপনা মলিন হতে বেশি সময় লাগেনি। রেমচুকভ এসব স্মরণ করে বলেন, ‘সেই সময় ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।’ ‘তার মেয়াদ শেষে, অনেক মানুষ তার প্রেসিডেন্সি নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন’, যোগ করেন তিনি।
সে কারণেই, আট বছরের মাথায় অন্তত জনসম্মুখে রাশিয়ার কর্মকর্তারা ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক। এমনকি প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন খোলস ছেড়ে বলেছেন, তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন করেন যদিও পুতিনের এই মন্তব্যকে ব্যাপকভাবে ক্রেমলিনের একটি ঠাট্টা (বা ক্রেমলিন বিদ্রুপ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। পুতিন দাবি করেছিলেন যে, তিনি কমলা হ্যারিসের ‘মোহনীয়’ হাসি পছন্দ করেছেন। কিন্তু এটা বুঝতে আপনার একজন ঘাগু রাজনীতিবিদ হওয়ার দরকার নেই যে, নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন হ্যারিস না, ট্রাম্প যা বলে আসছিলেন তা পুতিনের মুখশ্রীতে হাসি ফোটানোর নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের মাত্রা নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা, রাশিয়ার আগ্রাসন নিয়ে পুতিনকে দোষারোপ করা নিয়ে দৃশ্যত তার উদাসীনতা এবং প্রেসিডেন্টশিয়াল বিতর্ক করার সময় যুদ্ধে ইউক্রেনের বিজয় চান, এমনটা বলতে তার অস্বীকৃতিই এর প্রমাণ। অপরপক্ষে, কমলা হ্যারিস যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন যে ইউক্রেনের প্রতি সাহায্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত স্বার্থ’র মধ্যে পড়ে।
রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় টিভি তার প্রশংসা করেনি বিষয়টা এমন না। কয়েক সপ্তাহ আগে রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ উপস্থাপক কমলা হ্যারিসের রাজনৈতিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছিলেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, কমলা হ্যারিস বরং টিভির রান্নার অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ভালো করবেন।
ক্রেমলিনের পক্ষে অন্য একটি ভালো ফল হলো একটি চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, যার মাধ্যমে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে। এবং এর মাধ্যমে এমন একটি আমেরিকা পাওয়া যাবে, যে কিনা নির্বাচন-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা এবং পরস্পর মুখোমুখি অবস্থায় থাকবে যার পক্ষে ইউক্রেনের যুদ্ধসহ বৈদেশিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করার প্রয়োজনীয় সময় নেই।
বারাক ওবামার সময়ে ইউএস-রাশিয়ার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় আরও বাড়ে। ওয়াশিংটন থেকে সদ্য বিদায়ী রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতলি অনটোনভের ভাষ্য অনুযায়ী জো বাইডেনের সময় এই সম্পর্ক ‘ভেঙে পড়েছে’। ওয়াশিংটন এর জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর দোষারোপ করে। এটা ছিল জেনেভায় বাইডেন ও পুতিনের সাক্ষাতের মাত্র আট মাস পরে যখন ক্রেমলিনের নেতা ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন।
বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার ওপর শুধু নিষেধাজ্ঞার সুনামি বইয়ে দেয়নি, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে কিয়েভের আড়াই বছর টিকে থাকতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ সময় আমেরিকা যে আধুনিক অস্ত্রসম্ভার ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে তার মধ্যে রয়েছে আব্রাহাম ট্যাংক, হাইমারস রকেট সিস্টেম।
এটা এখন বিশ্বাস করা কঠিন যে এমন একটা সময় ছিল, বেশি দিন আগের কথা না, যখন রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে অংশীদার হিসেবে কাজ করাতে অঙ্গীকার করেছিল। আশির দশকের শেষের দিকে রোনাল্ড রিগ্যান ও মিখাইল গর্ভাচেভ তাদের নিজ নিজ দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার কমিয়ে আনার জন্য একটি ভূরাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন।
যদি রিগ্যানের জন্য কোনো একটি বিষয় উদযাপন করার থাকে, যেমনটা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি তা হলো ভঙ্গুর রাশিয়ায় গর্ভাচেভকে রাশান প্রবাদবাক্য বলা (‘কখনো ১৩২ বোতল শ্যাম্পেইন ক্রয় করো না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি নিশ্চিত হও যে, এটা একটি মূল্যবান উদযাপন’)।
১৯৯১ সালে আমেরিকা ও রাশিয়ার ফাস্টলেডি, বারবারা বুশ ও রাইছা গর্ভাচেভ, মস্কোতে একটি অপ্রচলিত মনুমেন্ট উন্মোচন করেন আটটি হাঁসের ছানাসহ একটি মা হাস। এটি ছিল বোস্টন পাবলিক গার্ডেনের ভাস্কর্যের একটি অনুলিপি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ, যা মস্কোকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। মস্কোর অধিবাসীদের মধ্যে এটি খুব জনপ্রিয়। রাশিয়ান জনগণ নভোডেভিচ পার্কে ব্রোঞ্জের নির্মিত পাখির সঙ্গে ছবি তোলার জন্য জড় হয়ে থাকেন, যদিও স্বল্পসংখ্যক ভ্রমণকারীরা এর পেছনের গল্প সম্পর্কে জানেন। এটি হচ্ছে ‘হাস কূটনীতি’; রাশিয়া-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মতো, এই হাসেরা কিছু আঘাতও গ্রহণ করেছে। কোনো একসময় কিছু হাস চুরি হয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময় যা আবার পুনঃস্থাপন করা হয়।
রাশিয়ানরা আমেরিকা ও মার্কিন নির্বাচন নিয়ে কীভাবে তা শুনতে আমি এই ভাস্কর্যের কাছে যাই। ‘আমি চাই আমেরিকা ধ্বংস হোক,’ বলছিলেন ইগোর নামে একজন বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি, যিনি পাশের পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই দেশটি পৃথিবীতে এতগুলো যুদ্ধের শুরু করেছে। সোভিয়েত সময়কাল থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের শত্রু ছিল এবং এটি এখনো তাই আছে। সেক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট কে এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।’
আমেরিকা রাশিয়ার চিরশত্রু এমন বৈশ্বিক ধারণার প্রতিফলন এখানকার রাষ্ট্রীয় মিডিয়াতেও দেখা যায়। ইগোর যে এত ক্ষুব্ধ ছিলেন, তিনি কি তার তথ্য রাশিয়ান টিভি থেকে পেয়েছিলেন; নাকি তার ছিপে যথেষ্ট মাছ ওঠেনি বলেই মূলত তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন আর আমার প্রশ্নের উত্তরে আমেরিকার ওপর সেই ক্ষোভ উগড়ে দিলেন!
কারণ, এখানে আমি আলাপ করেছি এমন বেশিরভাগ মানুষ আমেরিকাকে খারাপ শত্রু হিসেবে দেখে না। ‘আমি চাই শান্তি ও বন্ধুত্ব,’ বলছেন সেভেটলানা। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমার আমেরিকার বন্ধু এখন আমাকে ফোন করতে ভয় পায়। সম্ভবত সেখানে কোনো মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। বা সম্ভবত, এখানে রাশিয়ায় মতো প্রকাশের কোনো স্বাধীনতা নেই। আমি জানি না।’
‘যুদ্ধ ও কার বেশি ক্ষেপণাস্ত্র আছে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছেড়ে আমাদের দেশগুলো এবং জনগণ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু হওয়া উচিত,’ বলছেন নিকিতা। তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পকে চাচ্ছি। তিনি যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন বড় কোনো যুদ্ধ ছিল না।’
আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয় দেশের মধ্যে একটি সাধারণ ঐক্য রয়েছে এই দুই দেশেই পুরুষ প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
রাশিয়া কি কখনো এর পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছে?
‘আমি মনে করি এটা খুবই ভালো হবে যদি একজন নারী প্রেসিডেন্ট হন,’ বলছিলেন মারিনা। তিনি বলেন, ‘আমি একজন নারী প্রেসিডেন্টকে ভোট প্রদান করে খুবই খুশি হবো (রাশিয়ায়)। আমি বলছি না এটা ভালো বা খারাপ হবে। কিন্তু এটা হবে ভিন্ন কিছু।
বিবিসি অনলাইন থেকে ভাষান্তর নাজমুল আহসান
লেখক: ব্রিটিশ সাংবাদিক
বিবিসির রাশিয়া এডিটর, মস্কো
