কৌশলে একে একে বাগিয়ে নেওয়া হয় চারটি সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বড় প্রকল্পের কাজ। এসব কাজ হাতের মুঠোয় নেওয়ার পর একসঙ্গে করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। কোনো কাজই সময়মতো শেষ করতে পারেনি। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও অগ্রগতি হতাশাজনক। এসব প্রকল্প থেকে বছরের পর বছরেও মেলেনি কাক্সিক্ষত সুফল। উল্টো তৈরি হয়েছে জনদুর্ভোগ। এরপরও সম্প্রতি ফের পেয়েছে ২১ কোটি টাকার আরেকটি কাজ। আলোচিত এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি হলো মাহাবুব ব্রাদার্স।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা সিটি করপোরেশন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে মাহাবুব ব্রাদার্স। টাকার অঙ্কে এসব কাজের মূল্য ৪৩৫ কোটি টাকা। তবে এ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকল্পের কাজেই গতি নেই।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাহাবুব ব্রাদার্সের মালিক শেখ মাহবুবুর রহমান আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও সরকারি দপ্তরগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করে এসব কাজ বাগিয়ে নেন। তারাই অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সুযোগ করে দিয়েছেন। কাজ দেওয়ার সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবায়নের সক্ষমতা আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এমনকি এমনও প্রকল্প রয়েছে, যার পুরো টাকা তুলে নেওয়া হলেও এখনো কাজ বাকি অনেক।
শিপইয়ার্ড সড়ক : খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০১৩ সালের ৭ মে একনেক সভায় ৯৮ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় কাজ আটকে যায়। এরপর প্রকল্পটি সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে ২০২০ সালের ২১ জুলাই একনেক সভায় প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটি আবার অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি ২১ কোটি টাকা। তবে জমি অধিগ্রহণ বাদে ১৫৪ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যে ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের আদেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড এবং মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড (জেভি) ওই বছরের ২০ জানুয়ারি কাজ শুরু করে। যদিও এখন পর্যন্ত ভৌত অগ্র মাত্র ৭০ শতাংশ। এরই মধ্যে কাজের মেয়াদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। তবে ফের সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় সময়মতো কাজ করা যায়নি। এখন ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন বসানোর কারণে এ কাজ করা যাচ্ছে না। সড়কে এখনো দুটি স্তরে খোয়া ও পাথর দেওয়া বাকি রয়েছে। তবে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণকাজ চলছে।’
কেডিএর বিপণিবিতান : ষাটের দশকে নির্মাণ করা হয় খুলনা নিউ মার্কেট। কিন্তু মার্কেট ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে ওই মার্কেটটির পাশেই ১ দশমিক ৭ একর জমিতে বিপণিবিতান তৈরি করছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কেডিএ। দুটি বেজমেন্টসহ দশতলা ফাউন্ডেশনে প্রথমে হবে পাঁচতলা ভবন। এই মার্কেটে থাকবে ৩০০ দোকান। কেডিএর নিজস্ব অর্থায়নে ৯৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, কাজ শুরু হয় গত বছর ১৯ জুন, শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। সেই অনুযায়ী কাজ শেষ করতে ঠিকাদারের হাতে সময় রয়েছে মাত্র আড়াই মাস। তবে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪০ শতাংশ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজার এমডি ওয়াহিদ বলেন, ‘পাইল স্থাপন করতে পর্যাপ্ত জায়গা দরকার। কিন্তু এখানে সেই পরিমাণ জায়গা নেই। এ ছাড়া বর্ষার কারণে ঠিকমতো মাটি কাটা যায়নি। এসব কারণে বিলম্ব হয়েছে।’
প্রকল্পটির পরিচালক কেডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিএম মাসুদুর রহমান জানান, মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে মেয়াদ বাড়াতে আবেদন করা হয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি : ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) চারতলা ভবনের নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করছে মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয় দুই বছর। তবে প্রথম মেয়াদে কাজ শেষ হয়নি। দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে চারতলা ভবনের নিচতলার কাজই শেষ হয়নি এখনো। কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪০ শতাংশ।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজার মামুনুর রশিদ মঞ্জুর দাবি, নকশায় কিছু পরিবর্তন আসায় কাজে বিলম্ব হয়েছে। তবে এখন কাজ দ্রুত করা হবে।
সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিল প্রকল্প : নগরীর গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য শক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা থেকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ল্যান্ডফিল অ্যান্ড রিসোর্স রিকভারি ফ্যাসিলিটি শলুয়া’ প্রকল্প হাতে নেয় খুলনা সিটি করপোরেশন। ৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স। কার্যাদেশ অনুযায়ী চলতি বছর ২৬ জানুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তাই প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয় ৮ এপ্রিল পর্যন্ত। এ মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় ৩০ জুন পর্যন্ত ফের সময় বাড়ে। কিন্তু বর্ধিত দ্বিতীয় মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়াতে প্রকল্প পরিচালকের কাছে আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রকল্পের আওতায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সামনে অ্যাপ্রোচ রোডের উন্নয়ন হচ্ছে। ১ হাজার ১৮৫ মিটার দীর্ঘ এ সড়কটির নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
এ প্রসঙ্গে খুলনা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. আবদুল আজিজ বলেন, ‘বারবার বলা হচ্ছে। তবে কাজের অগ্রগতি ভালো না। সবমিলিয়ে কাজে ভৌত অগ্রগতি ২৫ ভাগ। তবে ল্যান্ডফিল্ডে সম্প্রতি কিছু মেশিন নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি পাইপ লাইন বসানোর কারণে অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে।’
সদর হাসপাতাল ভবন নির্মাণ : সদর হাসপাতালে ১২ তলা ফাউন্ডেশনের ওপরে ছয়তলা ভবন নির্মাণের কাজটিও নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স। ৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার চুক্তিতে ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষের মেয়াদ নির্ধারিত ছিল। তবে কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ে। তবে ধীরগতির কারণে এ মেয়াদেও কাজ সমাপ্ত হয়নি। এখন কাজের অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।
জানতে চাইলে গণপূর্তের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক চন্দ্র শীল বলেন, ‘কাজটি বঙ্গ বিল্ডার্সের নামে, কিন্তু বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজই করতে চায় না। এ কারণে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে বাস্তবায়নাধীন সবগুলো প্রকল্পের কাজে এমন ধীরগতিতে অসন্তোষ থাকলেও মহানগরীর পিটিআই মোড় থেকে রূপসা মোড় পর্যন্ত ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণের কাজ পেয়েছে বিতর্কিত এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশন এ কাজ দিলেও এখনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী খান মশিউজ্জামানের দাবি, সবকিছু যাচাই-বাছাই করে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মাহাবুব ব্রাদার্সের মালিক শেখ মাহবুবুর রহমান শেখ বাড়ি (সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাইদের বাড়ি) ও কেসিসির সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, প্রভাবশালী নেতা ও দপ্তরগুলো ম্যানেজ করে এসব কাজ বাগিয়ে নেন। কাজ দেওয়ার সময় যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এজন্য নেতা, সরকার ও সংস্থাগুলোই দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তারাই অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সুযোগ করে দিয়েছে। যার কারণে প্রতিষ্ঠানটি কাজগুলো না করে ফেলে রেখেছে।’
কুদরত-ই-খুদা আরও বলেন, ‘১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শের-ই বাংলা রোডের কাজ করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। সব টাকা তুলে নিয়েছে, অথচ এখনো অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে সুফল পাওয়া তো দূরে থাক, দুর্ভোগ ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।’
তবে এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যবসার স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সম্পর্ক হয়। তবে প্রতিযোগিতা করে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়েছেন। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। এখন সব কাজে গতি ফিরে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
