দেশবিরোধী চুক্তি বাতিলে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির ৬ দফা

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১৮ এএম

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে বাতিলের দাবি জানিয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি ও দুর্নীতির জন্য দায়ী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, উপদেষ্টাসহ জ্বালানি খাতের অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনাসহ ৬ দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত : বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি জানান কমিটির নেতারা। এ সময় তারা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে লুটেরামুক্ত করে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ দেন।

ছয়টি দাবির মধ্যে কমিটির অন্য দাবিগুলো হলো জাতীয় স্বার্থরক্ষায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য কমাতে স্বল্প মেয়াদে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিদ্যুৎ খাত পরিকল্পনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করা; দেশীয় গ্যাস উত্তোলন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো ও সাগরে গ্যাস উত্তোলনে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে প্রতিযোগিতামূলক বিডিং নিশ্চিত করা।

বৈঠকে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন করতে চাই। এ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে পরিবর্তন সূচনা করা। আমরা এ সরকারে কাছে দাবি জানাই, ভয়াবহ পিএসসি চুক্তি সেটা যেন অবিলম্বে বন্ধ হয়, দায়মুক্তি আইন, রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন বাতিল করা হয়।’

জ্বালানি অপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সক্ষমতার বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি এ দুইয়ের সংমিশ্রণ আমাদের বিদ্যুতের জন্য সব থেকে ভালো। এ দুইয়ের সংমিশ্রণে যদি আমরা আগাই, তাহলে বিদ্যুতের দামও কমবে, পরিবেশেরও ক্ষতি হবে না। একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।’

দেশের সম্পদের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে গ্যাস অনুসন্ধান করারও তাগিদ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জাতীয় কমিটি কাজ শুরু করেছিল গ্যাস রপ্তানির বিরোধিতা করে। বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুতের দরকার নেই। রামপাল, রূপপুর বাতিল করতে হবে। এটা বন্ধ না হলে বাংলাদেশের জন্য চরম ক্ষতি হবে। বর্তমান সরকারের কয়েকজন সুন্দরবন রক্ষা ও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। আশা করি, তারা এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেবেন।’

অনুষ্ঠানে অবিলম্বে কাতিহার-পার্বতীপুর-বারনগর ট্রান্সমিশন লাইন প্রকল্পের অনুমোদন বাতিলের দাবি জানানো হয়। যাতে করে ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ দিয়ে উৎপন্ন জলবিদ্যুৎ সরিয়ে নেওয়ার জন্য এটি ভারত ব্যবহার করতে না পারে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উজানে ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা এবং এগুলো বাস্তবায়ন থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি এক নয়। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি জ্বালানি অপরাধী হতে পারে। কিন্তু জ্বালানি অপরাধী দুর্নীতিবাজ নাও হতে পারে। দুর্নীতি চিহ্নিত করতে হবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আইনের আওতায়। জ্বালানি অপরাধীদের বিরুদ্ধে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে মামলা করতে হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বছরে বছরে যে পরিমাণ ব্যয় হয়, তা থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমাতে হবে। দেশের ৪০টা বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে।

শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে টনপ্রতি কয়লা আমদানিব্যয় কমবেশি ১০০ ডলার হলেও পিডিবি কয়লা কেনে ১৮৫ ডলারে। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা আনলে বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমানো যাবে।

প্রতিটি চুক্তির শর্ত এবং বিস্তারিত প্রকাশ করার দাবি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, ‘জাতীয় সম্পদের মালিকানা বিদেশিদের দেওয়া যাবে না, সেটা গ্যাসক্ষেত্র হোক কিংবা জমির কোনো মালিকানা হোক। যেখানে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা আছে, সেখানে আমরা বিদেশিদের ডাকব না। যেকোনো চুক্তি বা কাজে যথাযথভাবে টেন্ডারিং করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, অধ্যাপক ড. আনিস চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, ‘জনগণ যেন সঠিক দাম, মাপ ও মানে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ, প্রাথমিক জ্বালানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসেবা পায়, সেজন্য বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, সমতা, যৌক্তিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই কেন্দ্রের পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাপ করে তা জনগণের কাছে উন্মুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া আদানির চুক্তির পর্যালোচনারও দাবি তোলেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত