ইতিহাস পুনর্লিখন যেন শাঁখের করাত না হয়

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৪, ০২:০০ এএম

নতুন সময়ে, নতুন বাংলাদেশে সংস্কারের দাবি উঠছে, নেওয়া হয়েছে সংস্কারের নানা উদ্যোগ। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক-অর্থনীতির সেসব দরকারি সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা ও নানান উদ্যোগের পাশাপাশি গুঞ্জন চলছে ইতিহাস পুনর্লিখন, পরিমার্জন বা সংশোধন নিয়েও। সেটা হওয়াও স্বাভাবিক। কারণ গত ১৫ বছর ইতিহাসের একপাক্ষিক বয়ানে ঐতিহাসিক নানান অংশীজনকে অচ্ছুৎ করে ফেলা হয়েছিল।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে সর্বজনীন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ইতিহাস আমরা এখনো পাইনি। ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছায়, আগ্রহে, পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হয়েছে ইতিহাস। তাই আমাদের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কও ব্যাপক। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই দেশে ইতিহাস বদলে যায়, বলা যায় ইতিহাস রচনা, ইতিহাস চর্চা আর ইতিহাস প্রচারে ব্যাপক রদবদল আসে। মার্কিন লেখক ড্যান ব্রাউন বলেছেন, সব সময় বিজয়ীরাই ইতিহাস রচনা করে, সেই ইতিহাসে বিজিতদের করা হয় অবমাননা আর বিজয়ীদের করা হয় প্রশংসা। বাংলাদেশের ইতিহাস গবেষণা করতে গেলে ব্রাউনের কথাগুলোর হুবহু মিল পাওয়া যাবে।

ইতিহাস বাদ দেওয়া যায় না, ইতিহাস চর্চাকে অবহেলা করা যায় না। যে প্রজন্ম ইতিহাসকে অবজ্ঞা করে তাদের না থাকে অতীত, না থাকে ভবিষ্যৎ। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে নিরপেক্ষ এবং বৈজ্ঞানিক ইতিহাস চর্চা জরুরি। সেই আলোকেই সম্ভবত নতুন সরকার আমাদের ইতিহাস নতুন করে লেখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলেছে। পরিবর্তনটা আনতে যে তারা বদ্ধপরিকর কয়েকটি দিবস বাতিল এবং জাতির জনক বিষয়ে একজন উপদেষ্টার স্পষ্ট অবস্থান সেই বার্তাই দেয় আমাদের।

অভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার কর্তৃক ইতিহাস পুনর্নির্মাণ বা পুনর্লিখনের উদাহরণ আছে বিশ্বের নানা প্রান্তেই। আবার ইতিহাস নতুন করে লিখতে গিয়ে নতুন সংকট তৈরির ইতিহাসও অপ্রতুল নয়। সুতরাং ইতিহাস নতুন করে লিখতে যাওয়ার উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে শাঁখের করাতের মুখোমুখি হওয়ারই নামান্তর। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীনদের মনগড়া ইতিহাস পরিমার্জন না করলে নতুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের ভুল পাঠ থেকে যেমন বের হতে পারবে না, আবার নতুন করে লিখতে গিয়ে যদি নিরপেক্ষ না থাকা যায়, যদি যাকে যতটুকু সম্মান বা স্থান দেওয়ার তাকে ততটুকু না দেওয়া যায় তখনই শুরু হয় নতুন বিপত্তির। সতর্কতা তাই খুবই জরুরি।

ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রয়াস আমরা দেখেছি রাশিয়ায় বা সোভিয়েত ইউনিয়নে, ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর। ভøাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে নতুন সমাজতান্ত্রিক সরকার রাশিয়ার ইতিহাস পুনর্লিখনের বিশাল উদ্যোগ নেয়। ইতিহাস লিখতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জার শাসনের তীব্র সমালোচনা করা হয়, কিন্তু মুশকিল হলো নতুন রচনাগুলোতে লেনিনের বীরত্বপূর্ণ চরিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে তাকে প্রায় অস্বাভাবিক এক উচ্চতায় তুলে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জোসেফ স্টালিনের সময়েও এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী মতগুলোকে তো দমন করা হয়ই, ইতিহাস থেকে তাদের মুছে ফেলারও নানান আয়োজন চলে।

১৯৪৯ সালের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর মাও সে তুং-এর সরকার চীনের ইতিহাস পুনর্গঠন করার বিশাল প্রচেষ্টা চালায়। তাদের রচিত ইতিহাসে প্রাক-কমিউনিস্ট নেতাদের নানাভাবে অবমূল্যায়ন করার পাশাপাশি মাও সে তুংকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়ে দেয়। দেশটিতে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালে পরিচালিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ভিন্নমতাবলম্বী বই-পুস্তক, ঐতিহাসিক নানা তথ্যপ্রমাণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

১৯৭৫ সালে পলপটের নেতৃত্বে খেমাররুজ ক্ষমতায় আসার পর কম্বোডিয়ার সমাজ ও ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করা হয়। খেমাররুজরা মূলত গ্রামীণ সমাজতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে শাসনব্যবস্থা প্রচলনের চেষ্টা চালায়, শহুরে শিক্ষিত এলিটদের ইতিহাস মুছে ফেলে এক ধরনের গ্রামীণ কল্পলোক বা ইউটোপিয়া প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তারা। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করা হয়, এবং দেশের প্রাচীন ইতিহাসকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়।

এ রকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, তালিকা বেশ লম্বা। কিন্তু এই যে ইতিহাস নতুন করে রচনার উদ্যোগ তার ফলাফল কী? বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বৈপ্লবিক সংস্কার বা ইতিহাস-ঐতিহ্যের খোলনলচে বদলে ফেলার প্রচেষ্টা সবসময়ই সবার জন্য সুফল বয়ে আনেনি। আতঙ্কের জায়গাটা এখানেই। তুরস্কের কথা বলা যেতে পারে। কামাল আতাতুর্কের তুরস্কে সংস্কারগুলো মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা ও পশ্চিমা আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এবং তিনি অটোমান ইসলামি অতীতকে ইতিহাসের দলিলসমূহ থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। এতে করে তুরস্কে আধুনিকীকরণ এসেছে কিন্তু একটা বিশাল জনগোষ্ঠী এই সংস্কারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেনি, তারা নতুন ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন। কামাল আতাতুর্কের সময় ১৯২৮ সালে তুর্কি ভাষার বর্ণমালা আরবি থেকে ল্যাটিনে পরিবর্তন করা হয়। এর ফলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আরবি ভাষায় লিখিত  ৬০০ বছরের অটোমান ইতিহাসের একটি বড় অংশের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

কোনো সরকার ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা করলে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যদি সেই পুনর্লিখন প্রক্রিয়ায় কোনো গোষ্ঠীকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। সেই সামাজিক বিভাজন দুঃখজনক নানা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। রুয়ান্ডাতে ১৯৯৪ সালে গণহত্যা চলে, এতে প্রাণ হারায় প্রায় ৮ লাখ মানুষ। এই ভয়াবহ গণহত্যার মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় বেলজিয়ান ঔপনিবেশিক শাসক কর্তৃক রুয়ান্ডার ইতিহাস বিকৃতির ঘটনাকে। সেই ইতিহাসে টুটসিদের প্রায় ইউরোপীয়দের মর্যাদা দিয়ে হুতিদের তাদের ঐতিহাসিক অধীনস্ত জাতি হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ হুতি আর টুটসি মূলত একই সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। বিকৃত নতুন ইতিহাস প্রতিবেশী দুটো জাতির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভয়ংকর বিভাজন তৈরি করে দেয়। ১৯৯০-এর দশকে যুগোসøাভিয়ার ভাঙনের কারণ হিসেবে ইতিহাস বিকৃতি করে জাতিগত উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়াকেই অনেকে দায়ী করেন। জাতিগত বিভেদের বিকৃত এক ন্যারেটিভ তৈরি করে স্লোবোদান মিলোসেভিচ যে যুদ্ধ শুরু করেন তাতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, লাখ লাখ মানুষ হয় বাস্তুচ্যুত। 

ইতিহাস নতুন করে লিখতে গেলে কোনো দেশে ঐতিহাসিক শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় নতুন ক্ষমতাসীন সরকার পুরনো সবকিছু এমনভাবে বাতিল করে দেয়, সবকিছু এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যে একটা সময়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়ে যায়। তৈরি হয় সাংস্কৃতিক বিস্মৃতির। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় চীনের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বই-পুস্তক, মন্দির এবং ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন ধ্বংস, পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীদের কারাবরণ বা মৃত্যুদ-ের মাধ্যমে দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ক্ষতি হয়। এই সময়ে লাখ লাখ ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে চীনের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে একটি স্থায়ী শূন্যতা তৈরি হয়।

আলোচনাটা নিঃসন্দেহে দীর্ঘতর করা সম্ভব। আলোচনার সারমর্ম হলো- রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকার রাজনীতি-অর্থনীতিসহ সমাজের নানা বিষয়ে সংস্কারে উদ্যোগী হবেই, এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ইতিহাস সংশোধন বা পরিমার্জনের উদ্যোগও চলে আসতে পারে। কিন্তু এর প্রক্রিয়াটা বাছাই করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে, কারণ এর সঙ্গে ঝুঁকিগুলো স্পষ্ট, তীব্র এবং ধারালো। তাই নতুন বাংলাদেশের ইতিহাস পুনর্লিখনের জন্য চাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। এই প্রক্রিয়ায় ঐতিহাসিক সব ঘটনা, কণ্ঠ, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বর্ণনার নির্মোহ পরিসর নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাসে বিজয় যেমন আছে, তেমনি আছে নানা বিয়োগান্ত ঘটনা ও বিষয়াবলি। ইতিহাস পুনর্লিখনের সব প্রচেষ্টাতে জাতীয় ঐক্যের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করা, এমনকি যারা একসময় উপেক্ষিত ছিল তাদেরও ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। আবেগ, ক্ষোভের বা লোভের বশবর্তী হয়ে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার উদ্যোগ আবার গত রেজিমের মতো একপাক্ষিক ইতিহাসের বয়ান উভয়ই ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর হওয়াই স্বাভাবিক।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত